২০৩০ সাল নাগাদ ১ হাজার কোটি ডলার রফতানির সম্ভাবনা

বাছির জামাল :
আইসিটি শিল্পের বিকাশে হাইটেক ও সফটওয়্যার পার্ক এবং বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণ কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, যশোর, সিলেট, রাজশাহী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব পার্ক ও ইনকিউবেশন সেন্টারের নির্মাণ কাজ চলছে। সরকার আশা করছে, ২০২১ সালের মধ্যে আইসিটি রফতানি পাঁচ বিলিয়ন ডলার ও আইটি পেশাজীবীদের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত হবে। এর পাশাপাশি জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ শতাংশ নিশ্চিত করা যাবে। অন্যদিকে ২০৩০ সাল নাগাদ এসব হাইটেক পার্ক থেকে এক হাজার (১০ বিলিয়ন) কোটি ডলারের সফটওয়্যার ও সেবা রফতানি করা সম্ভব হবে। এ ছাড়াও আইটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও এসব পার্ক ও ইনকিউবেশন সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে তথ্য ও যোগাযোগর প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, একুশ শতকের চাহিদা মেটাতে দেশে ১২টি আইটি পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। যার মধ্যে যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণের কাজ সমাপ্তির পথে। এ পার্ক সংলগ্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে কন্টেইনারভিত্তিক ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার- যা এশিয়ায় প্রথম। তিনি বলেন, আইটি বিভাগে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামী তিন বছরের মধ্যে এক লাখ ব্যক্তিকে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, তারা দেশের ১২টি হাইটেক পার্ক নিয়ে তিন মেয়াদের একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। কর্তৃপক্ষ ২, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি ওই পরিকল্পনায় একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপও তৈরি করেছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ওই পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়ে যেতে পারলে উল্লিখিত টার্গেটে পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। এর পাশাপাশি ওই পরিকল্পনাপত্রে হাইটেক পার্কগুলোর বর্তমান অবস্থা, কাজের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়েছে।
কালিয়াকৈর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি: ঢাকার অদূরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩৫৫ একর জমির ওপর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি নির্মাণ কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় এর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাঁচটি ব্লকে বিভক্ত দুটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২ ও ৫নং ব্লকের উন্নয়ন করছে সামিট টেকনোসিটি লিমিটেড, অন্যদিকে ৩নং ব্লকের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করছে ফাইবার অ্যাট হোমের কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ টেকনোসিটি লিমিটেড। পার্কটিতে বিনিয়োগের ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার ওয়েসিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান এবং সৌদি আরবের আল রাজি গ্রুপের সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে ইতিমেধ্যে। পার্কটিকে কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে মৌলিক অবকাঠামোর নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক: যশোরে ১৩ একর জমির ওপর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ১৫ তলাবিশিষ্ট মূল ভবনের ১১ তলা এবং ১২ তলা ডরমেটরি ভবনের ৬ তলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে। দুটি ভবনের বাকি অংশের কাজ চলতি বছরের এপ্রিল মাস নাগাদ সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।
আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলক জানান, যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরা হলো সফটওয়্যার সপ লিমিটেড, অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেড, ওয়েব হাকস আইটি লিমিটেড, অ্যাডভান্স সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এ্যাপসিস, এমএস সাজ টেলিকম অ্যান্ড ফ্যাশন, ওয়াটার স্পিড, ইজেনারেশন লিমিটেড, আমরা হোল্ডিংস লিমিটেড, ডব্লউথ্রি ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেড এবং জাপানের ডেসটিনি। এখানে মোট ৩৮ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই পার্কে ১৬ হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে তিনি জানান।
জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর রাজধানীর জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ও কানেকটিং স্টার্ট-অ্যাপসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ইতিমধ্যে এর প্রায় ১০টি স্টার্ট-আপ কোম্পানিকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করে প্রয়োজনীয় সিড ফান্ড ও সার্বিক সহযোগিতাসহ এক বছরের জন্য স্পেস বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাকি ৪০টি কোম্পানিকে তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীতা সাপেক্ষে সার্বিক সহযোগিতাসহ এক বছরের জন্য স্পেস ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ১৬টি কোম্পানি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ১৬২ দশমিক ৮৩ একর জমিতে পিপিপি মডেলের আওতায় সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি স্থাপন করা হচ্ছে। আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি এ সিটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পার্কের ভূমি উন্নয়নসহ প্রাথমিক অবকাঠামো যেমন রাস্তা, স্যুয়ারেজ লাইনের কাজ অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বছরই ভবন নির্মাণ শেষ হবে বলে জানিয়েছে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।
সফটওয়্যার সার্টিফিকেশন সেন্টার: সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সেবা প্রদান কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এসব সফটওয়্যারের সার্টিফিকেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ‘সফটওয়্যার কোয়ালিটি পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠাকরণ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ইতিমধ্যে এ সেন্টার স্থাপনের জন্য এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট আহ্বান করেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় সফটওয়্যারের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।
রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু সিলিকন সিটি: রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু সিলিকন সিটি নামে একটি হাইটেক পার্ক স্থাপিত হচ্ছে। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ সিটি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়। এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৮ দশমিক ৭০ কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়ন করা হবে ২০১৯ সালের মধ্যে। প্রকল্পের আওতায় ২ লাখ বর্গফুটবিশিষ্ট ১টি ১০ তলা ভবন, ভূমি উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও সীমানা প্রাচীরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ৩১ দশমিক ৬২ একর জমিজুড়ে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৪ হাজার তরুণ-তরুণীর তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
১২টি আইটি পার্ক: অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইটি বা আইটিইএস শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেশের ১২টি স্থানে যথাক্রমে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, কুমিল্লা সদর, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজারের রামু, রংপুর, নাটোরের সিংড়া, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, খুলনার কুয়েটে একই ডিজাইনে আইটি পার্ক নির্মাণের জন্য ‘১২ আইটি পার্ক স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জনবল ইতিমধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে অনুমোদিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ঘোষণা: বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বেসরকারি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ঘোষণার লক্ষ্যে একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে। এ গাইডলাইনের আওতায় ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি ৭টি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.