৯ বছর পর ভিকারুননিসা গভর্নিং বডি নির্বাচন ২২ এপ্রিল

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন আগামী ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। মামলা, অ্যাডহক কমিটি, আবার কখনো বিশেষ কমিটির গ্যাঁড়াকলে প্রায় নয় বছর আটকে ছিল নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাজনীতি। পোস্টার-ব্যানার আর ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির আশপাশের এলাকা। প্রার্থীরা ছুটছেন অভিভাবকদের কাছে।
জানা গেছে, ২০০৮ সালে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল। দু’বছর পরপর গভর্নিং বডির নির্বাচন হওয়ার বিধান থাকলেও ২০১১ সালে ছাত্রী শ্লীলতাহানিকারী শিক্ষক পরিমল জয়ধরের শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে ওঠে। ওই সময় কমিটির সভাপতি স্থানীয় এমপি রাশেদ খান মেনেনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে আবারো রাজনৈতিক কর্তৃত্বে স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং কমিটির সভাপতি হন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক অভিভাবকের মামলার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি হাইকোর্ট কর্তৃক রায়ে স্থানীয় এমপিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটির সভাপতি পদ থেকে অপসারণ বা বহিষ্কারের রায় দেয়া হয়। এতে করে অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নেয়। ঢাকা জেলা প্রশাসক স্কুল ও কলেজ শাখায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় দীর্ঘদিন পর গভর্নিং বডির নির্বাচনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। স্কুল-কলেজ ব্যবস্থাপনা
কমিটির প্রবিধান অনুযায়ী ১১ সদস্যবিশিষ্ট গভর্নিং কমিটিতে নির্বাচিত সদস্য হচ্ছেন ৯ জন। এদের মধ্যে অভিভাবক প্রতিনিধি ৬ জন, শিক্ষক প্রতিনিধি ৩ জন এবং ১ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। ৬ জন অভিভাবক প্রতিনিধির মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শাখার জন্য ২ জন করে এবং প্রাথমিক শাখার জন্য একজন করে মোট ৫ জন। একজন হবেন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য। ৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধির মধ্যে স্কুল ও কলেজ শাখা থেকে একজন করে এবং একজন নারী শিক্ষক। গভর্নিং কমিটির অপর দুই অনির্বাচিত সদস্য হচ্ছেন স্থানীয় এমপি মনোনীত একজন এবং পদাধিকার বলে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মূল ও শাখা ক্যাম্পাসগুলোতে প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণা চলছে। এবারের নির্বাচনের নতুন সংযোজন হচ্ছে সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য একজন নারী অভিভাবক প্রতিনিধি। ফলে পুরুষ অভিভাবকদের পাশাপাশি এবার নারী অভিভাবকরাও প্রচারণায় নেমেছেন পৃথকভাবে। এর ফলে প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য একজনকে মাত্র নির্বাচিত করতে হলেও নারী অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। অভিভাবক প্রতিনিধি পদের প্রার্থীরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অভিভাবকদের বাড়িঘর সরগরম করে তুলেছেন। বেইলি রোডের প্রায় পুরো এলাকার ভবনগুলোর দেয়ালে দেয়ালে এখন রংবেরঙের পোস্টার। কোনো কোনো প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকেও প্রচারণা চালাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর নির্বাচন হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা বেশ। বেশ কয়েক অভিভাবকের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলছেন, মেয়েদের প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে পুরুষ অভিভাবকরা মেয়েদের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নানা সমস্যা নিয়ে মোটেই সচেতন নন। সংরক্ষিত মহিলা আসনের নারী অভিভাবকরা তাই আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় এবং যোগ্য নেতাকে গভর্নিং কমিটিতে নির্বাচিত করতে চান। সংরক্ষিত আসনের জন্য বসুন্ধরা ক্যাম্পাসের অভিভাবক প্রার্থী কামরুন্নাহার খানম বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরে মেয়েদের জন্য ওয়াশরুমের অবস্থা ভয়াবহ। অনেক বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অভিভাবকদের অপেক্ষার জন্য কোনো ছাউনি নেই। এমন হাজারো সমস্যার সমাধানে অভিভাবকদের সমর্থন প্রত্যাশা করছেন তিনি।
প্রার্থী যারা: অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে ৯টি পদের জন্য এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪২ জন প্রার্থী। এর মধ্যে অভিভাবক হচ্ছেন ৩০ জন আর শিক্ষক হচ্ছেন ১২ জন। এই নির্বাচনে ২৩ হাজার ভোটার ভোট প্রদান করবেন। এর মধ্যে বেইলি রোডের মূল ক্যাম্পাসে ভোটার ১৩ হাজার, বসুন্ধরায় সাড়ে ৫ হাজার, ধানমণ্ডি ক্যাম্পাসে হচ্ছেন ১৭শ’ আর আজিমপুরে ২ হাজার ৮শ’ জন ভোটার রয়েছেন। বেইলি রোডে প্রধান শাখায় ২২ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ স্তরে অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিযোগিতা করছেন সাতজন। তারা হলেন- আফরোজা আলিম, রাজু আলীম, মো. ইউনুছ আলী আকন্দ, আতাউর রহমান, এনায়েত করিম, মোশারফ হোসেন ও সাবিনা চৌধুরী। মাধ্যমিক স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৯ অভিভাবক প্রতিনিধি প্রার্থী হচ্ছেন আনোয়ার কবির ভূঁইয়া, এবিএম মনিরুজ্জামান, জাফর আহমেদ ভূঁইয়া, মুজিবুর রহমান হাওলাদার, মারুফ আহমেদ মনসুর, ফয়সাল বাবুল, সহিদুল ইসলাম জমাদার, হেলাল উদ্দিন ও সিদ্দিকী নাছির উদ্দিন। প্রাথমিক স্তরে ১০ জন অভিভাবক প্রতিনিধি হচ্ছেন আতিকুর রহমান দর্জী, আনিসুর রহমান, গাজী কাউসার আহমেদ, খাজা সলিম উল্লাহ, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, মীর মো. শাহাবুদ্দিন, তাওহীদুল হক, মো. শাহ আলম, মো. সোহেল ও সুজাউদ্দিন আহমেদ। সংরক্ষিত নারী অভিভাবক সদস্য হিসেবে প্রতিযোগিতা করা চারজন হলেন রানী পারভীন, কামরুন্নাহার খানম, তিন্না খুরশীদ জাহান ও মুর্শিদা আখতার। আর শিক্ষক প্রতিনিধি প্রার্থী হিসেবে কলেজ স্তরে দুজন, বিদ্যালয় স্তরে ছয়জন ও সংরক্ষিত নারী শিক্ষক প্রতিনিধি পদে লড়ছেন চারজন।
এ প্রসঙ্গে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুন বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে, এ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। তবে, অতীতের নির্বাচিত কমিটি নিয়েও আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর এ প্রতিষ্ঠানে গত ৯ বছর নির্বাচন হচ্ছে না। কখনো বিশেষ কমিটি কিংবা অ্যাডহক কমিটি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে। সর্বশেষ অ্যাডহক কমিটির ৬ মাসের মেয়াদও শেষ হয়েছে। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০১৭ সালের নির্বাচন কমিশনার ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আশা করি, ভালো নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস