‘২২ বছর পর মাটির টানেই দেশে এসেছি’

‘বন্ধু তোমারও লাগিয়া হইলাম গো আমি বনবাসি। কি দিয়া ফুটাবো বলো তোমার মুখের হাসি’- বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না ছবির এই বিখ্যাত গানটি গেয়েই নায়িকা জ্যোৎস্নাকে মালা দিয়ে বরণ করে নিলেন রাজকুমার ইলিয়াস কাঞ্চন। তবে পর্দায় নয়। জ্যোৎস্না রূপী অঞ্জু ঘোষকে এভাবেই গতকাল রোববার বিকেলে এফডিসিতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বরণ করে নেন ইলিয়াস কাঞ্চন। শুধু তাই নয়, সঙ্গে ২ জনকে পুরনো স্মৃতি রোমন্থনে কিছুটা আবেগআপ্লুত হয়েই ভাব বিনিময় করতে দেখা যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ছবির এই নায়ক নায়িকাকে। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর পর কেন হঠাৎ দেশে এলেন অঞ্জু ঘোষ?

সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে নায়িকা বলেন, ‘মাটির টান। শুধুমাত্র মাটির টানেই আমি আবার আমার দেশে ফেরত এসেছি। আর কোনো কারণ নেই। তবে আমার ইচ্ছে ছিল আমি আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরব। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি মারা যাওয়ায় সেটা সম্ভব হলো না।’ কথাগুলো বলার সময় বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে যান নায়িকা।

তিনি আরো বলেন, ‘২২ বছর পর আবার নিজের দেশে আসতে গিয়ে নানা বাধার মধ্যে পড়েছি। তবে সেসব বিষয়ে আমি এখন কথা বলতে চাই না। সব ভুলে গেছি আপনাদের সবার ভালোবাসা পেয়ে। অনেক দিন পর দেশে এসেছি, এতটা ভালোবাসা পাব সত্যি ভাবতে পারিনি আমি। আপনারা আমার আপনজন। আপনাদের মাঝে আসতে পেরেছি এতেই আমি খুশি।’

তাহলে কিসের অভিমানে দেশ ছেড়েছিলেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কারো প্রতি অভিমান করে আমি দেশ ছাড়িনি। আমার কারো প্রতি কোনো অভিমান নেই। ২২ বছর আগে মাত্র ২ দিনের জন্য কলকাতায় গিয়ে ওখানেই থেকে যাব ভাবতে পারিনি। আমি বার বার বাংলাদেশে আসতে চাই।’

সম্প্রতি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশে ছবি প্রযোজনা করবেন অঞ্জু ঘোষ। তাহলে কি এটা শুধুই গুঞ্জন? উত্তরে কিছুটা এড়িয়েই গেলেন আশির দশকের এই সফল নায়িকা। বলেন, ‘বাংলাদেশে আমি খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছি। তবে এসে আমি অনেক দুঃখিত হয়েছি বলতে পারেন। আমাদের সময় প্রচুর ছবি নির্মাণ হতো এখানে। অনেক ঝলমলে আলো ছিল। কিন্তু এখন সেসব কোথায়? সব জায়গায় কেমন যেন একটা সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। এটা আমাকে সত্যি খুব ব্যথিত করেছে। এই শিল্প আমাদের সবার। আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমি এখনো এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি খুব ভালো জানি না। তবে আমাদের সবাইকে এই শিল্পে দর্শক ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।’

প্রসঙ্গত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান অঞ্জু ঘোষ ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে ভোলানাথ অপেরার হয়ে যাত্রায় নৃত্য পরিবেশন করতেন ও গান গাইতেন। ১৯৮২ সালে এফ কবীর চৌধুরী পরিচালিত ‘সওদাগর’ সিনেমার মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। এই ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হওয়ায় দ্রুতই প্রসার ঘটে তার। তবে বাণিজ্যিক ছবির তারকা হিসেবে যতটা সফল ছিলেন অঞ্জু ঘোষ, সামাজিক ছবিতে ততটাই ব্যর্থ হন।

১৯৯১ সালে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুনদের আগমনে তিনি ব্যর্থ হতে থাকেন। এর কয়েক বছরের মাথায় তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান ভারতে এবং কলকাতার চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে থাকেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে তিনি ভারতের বিশ্বভারতী অপেরার যাত্রাপালায় নিয়মিত অভিনয় করতেন। বাংলাদেশে তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘বড় ভালো লোক ছিলো’, ‘আবে হায়াত’, ‘প্রাণ সজনী’, ‘ধন দৌলত’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘রক্তের বন্দি’, ‘আওলাদ’, ‘চন্দনা ডাকু’, ‘মর্যাদা’, ‘নিয়ত’, ‘দায়ী কে’, ‘কুসুমপুরের কদম আলী’, ‘অবরোধ’, ‘শিকার’, ‘রঙ্গিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘চোর ডাকাত পুলিশ’, ‘শঙ্খমালা’, ‘আদেশ’, ‘আয়না বিবির পালা’, ‘এই নিয়ে সংসার’ ও ‘প্রেম যমুনা’।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.