২২ অধিবেশনে আলোচিত ১৮২ আইন পাস

বেআইনিভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অভিযোগ মাথায় নিয়ে চলা দশম জাতীয় সংসদ শেষ হচ্ছে আইন পাসে রেকর্ড গড়ার মধ্য দিয়েই। আগামী ২১ অক্টোবর বসছে বিদায়ী অধিবেশন। স্বল্পকালীন এই অধিবেশনটি শেষ হওয়ার পর পরই ডামাডোল বেজে যাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। শুরু হয়ে যাবে আগামীর সংসদের নেতৃত্বে কারা আসবেন সেই হিসাব নিকাশ। তবে যতই অভিযোগ আর অনুযোগ থাকুক না কেন আলোচিত আইন পাসের রেকর্ড গড়ার মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ বেঁচে থাকবে ইতিহাসের পাতায়।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যমতে, ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া দশম জাতীয় সংসদ এ পর্যন্ত ২২টি অধিবেশন সম্পন্ন করেছে। আর এই ২২ অধিবেশনে ৪১৭ কার্যদিবসে পাস করেছে জনগুরুত্বপূর্ণ ১৮২টি আইন। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সড়ক পরিবহন আইন, সংবিধান সংশোধনী আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, কওমি মাদরাসার সনদকে মাস্টার্সের সমমান দিতে করা আইনসহ আলোচিত অনেক আইন পাস হয়েছে। তথ্যমতে, চলতি বছরে অনুষ্ঠিত হওয়া চার অধিবেশনে পাস হয়েছে ৫২টি আইন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আইন পাস করে রেকর্ড গড়েছে ক’দিন আগে শেষ হওয়া ২২তম অধিবেশনটি। মাত্র ৮ কার্যদিবসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সড়ক পরিবহন আইনসহ আলোচিত ১৮টি পাস হয়েছে এই অধিবেশনে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা চলমান দশম জাতীয় সংসদ গত বছর পর্যন্ত মোট ১৮টি অধিবেশন সম্পন্ন করে। মোট কার্যদিবস ছিল ৩৪২ দিন। এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা অধিবেশন ছিল প্রথমটি। ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া ৩৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শেষ হয় ১০ এপ্রিল। আর সব থেকে ছোট অধিবেশন ছিল মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের। গত বছর অনুষ্ঠিত ১৫তম ও ১৭তম অধিবেশন এবং চলতি বছরের ২০তম অধিবেশন। এই সময়ের মধ্যে (চার বছরে) ১৩০টি আইন পাস হয়েছে সংসদে। ১৪টি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। আর চলতি বছরে চার অধিবেশনে সংসদ বসে ৭৫ কার্যদিবস। বিল পাস হয় ৫২টি।

সংসদ সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম (১৯তম) অধিবেশনটি চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৩৫ কার্যদিবস চলে। এই সময়ে ১৫টি বিল পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা হয়েছে ৬৪ ঘণ্টা ৯ মিনিট। এতে সরকার ও বিরোধী দলের ২৩৩ জন এমপি অংশ নেন। এ ছাড়া কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে ২০৪টি নোটিশ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ১৮টি গৃহীত এবং ১১টি নোটিশ আলোচিত হয়। একই সঙ্গে একাত্তরের ‘ক’ বিধিতে ৩৭টি নোটিশ নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর দেয়ার জন্য ২১৩টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৮৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তর দেয়ার জন্য ৩ হাজার ২৫৮টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। যার মধ্যে মন্ত্রীরা জবাব দেন ২ হাজার ২৫৮টি প্রশ্নের।

এরপর মাত্র ৫ কার্যদিবস চলে ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া ২০তম অধিবেশনটি। এ অধিবেশনে ৫টি সরকারি বিল পাস হয়। অধিবেশনের শেষ কার্য দিবসে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জনগণকে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর ১৪৭(১) বিধিতে সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

পরের (২১তম) অধিবেশনটি মূলত ছিল এই সরকারের শেষ বাজেট অধিবেশন। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ২৫ কার্যদিবসের এই অধিবেশন ছিল প্রাণবন্ত। অধিবেশনে বাজেটের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ছিলেন এমপিরা। ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন। এরপর প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ২২৩ জন সদস্যের ৫৫ ঘণ্টা ৫৫ মিনিটের সাধারণ আলোচনা শেষে ২৮ জুন পাস হয় এই মেগা বাজেট। এই অধিবেশনেই সংসদে সংরক্ষিত নারী আাসনের মেয়াদ আরো ২৫ বছর বাড়াতে উত্থাপিত সংবিধান সংশোধনী বিলসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি বিল পাস হয়েছে। এ ছাড়া কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে ১৮০টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১২টি নোটিশ গৃহীত হয়। গৃহীত নোটিশের মধ্যে ৭টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়।

এ ছাড়াও ৭১(ক) বিধিতে এমপিদের উত্থাপিত ৩৮টি নোটিশ নিয়ে দুই মিনিট করে আলোচনা হয়। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত দিনগুলোতে মোট ১৬৫টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬৭টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ২ হাজার ৮৮১টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ২ হাজার ২৯টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে মন্ত্রীরা ৩০০ বিধিতে কয়েকটি বিবৃতি দিয়েছেন।

চলতি সংসদে বিল পাসে রেকর্ড গড়ার অধিবেশনটি ছিল মূলত ২২তম অধিবেশনটি। ক’দিন আগেই শেষ হওয়া অদিবেশনটি ১০ কার্যদিবসের থাকলেও প্রথম দিন র্বতমান সংসদের দু’জন সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় অন্য সব কার্যসূচি স্থগতি থাকে। আর ১১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে এক ঘণ্টা অধবিশেন চালানোর পর স্থগিত করতে বাধ্য হন স্পিকার। যে কারণে ১০ দিন চললেও মূলত সংসদে সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয় মাত্র ৮ কার্যদিবস। স্বল্পকালীন এই অধিবেশনটিই বিল পাসের ক্ষেত্রে গড়েছে অনন্য রেকর্ড। আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল, সড়ক পরিবহন বিলসহ জনগুরুত্বপূর্ণ ১৮টি বিল পাস হয়েছে এই ক’দিনে।

অধিবেশনের শেষ দিনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিল, পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরি শর্তাবলি) বিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট বিল ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা বিল পাস হয়। এর আগে বুধবার পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল, সড়ক পরিবহন বিল এবং কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর পাস হয় বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড (সংশোধন) বিল, কৃষি বিপণন বিল ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল নামের তিনটি বিল। এ ছাড়া ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি বিল ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বিল, ১৬ সেপ্টেম্বর সার (ব্যবস্থাপনা) (সংশোধন) বিল ও যৌতুক নিরোধ বিল, ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেট মেডিকেল বিশ্বদ্যিালয় বিল এবং ১২ সেপ্টেম্বর বস্ত্র বিল, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিল পাস হয়।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ