১৩০ দিনের যন্ত্রণা ভুলতে চান বাবুগঞ্জের মেহেদীর পরিবার

নিখোঁজের ১৩০ দিন পর বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দুই যুবকের মধ্যে বিএম কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান তার বাড়িতে ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর ফিরে আসায় মেহেদীর বাড়িতে সবাই আল্লাহর দরবারে শুকরানা আদায় করেন। গত মঙ্গলবার ফিরে আসা মেহেদী বাবুগঞ্জের বাহেরচর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদারের ছেলে। কিন্তু এখনো খোঁজ মেলেনি মেহেদীর সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া একই এলাকার আনিসুর রহমান ঘরামির ছেলে সুজন ঘরামি ও তাদের অপর ২ বন্ধুর। অভাবের তাড়নায় ১১ বছর পূর্বে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় সারা যাকেরের এশিয়াটিক ফার্মে চাকরি নেয় সুজন ঘরামি। চাকরির পাশাপাশি তিনি এ সময় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। অপর নিখোঁজ ২ যুবক হচ্ছে- নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাফায়াত হোসেন ও জাইন হোসেন খান।
গত ১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মেহেদী হাসান ও একই গ্রামের বন্ধু সুজন ঘরামিসহ ৪ জন বনানীর নর্দান ক্যাফে রেস্তোরাঁয় খেয়ে বের হন। মেহেদী জানান, রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে তারা ৪ জন হাঁটছিলেন। এ সময় অন্ধকার রাস্তায় হঠাৎ কেউ পেছন থেকে তার বাঁ হাত আটকে নাকে রুমাল চেপে ধরে। যখন জ্ঞান ফেরে তখন একটি কক্ষে পাকা মেঝেতে নিজেকে চোখ-হাত বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করেন। সেখানে তাকে সময়মতো খেতে দেয়া হতো এবং টয়লেটে নেয়া হতো। শুধু খাবারের সময় তার হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হতো। সব সময় চোখ বাঁধা ছিল। তাকে নির্যাতন করা হয়নি। তবে একই সঙ্গে নিখোঁজ সুজনসহ অপর ৩ জন কোথায় আছে তা বলতে পারেননি মেহেদী।
গত মঙ্গলবার সাভারের নবীনগর এলাকায় মহাসড়কের পাশে একটি গাছে হেলানো অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেন বরিশাল বিএম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী মেহেদী। নিখোঁজের সময় তার সঙ্গে থাকা ল্যাপটপ, কাপড়-চোপড়-টাকা সবই অক্ষত, অর্থাৎ তার সঙ্গেই ছিল। এরপর তিনি বাসযোগে গ্রামের বাড়ি বাবুগঞ্জে ফিরে আসেন।
মেহেদীর বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার বলেন, তার ছেলে যেন আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে সে ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চান। একই সঙ্গে যারা তাকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিল তাদের শনাক্ত করে বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, কোনো পরিবারকে যেন এভাবে যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়।
বাবুগঞ্জ থানার ওসি আবদুুস সালাম জানান, মেহেদী নিখোঁজের ঘটনায় বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল। তার বাড়ি ফিরে আসার খবর পেয়ে পুলিশ তার গ্রামের বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মেহেদীর নিখোঁজ হওয়া, আটকে রাখা এবং নবীনগরে আবিষ্কারের ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য কিনা জানতে চাইলে বাবুগঞ্জ থানার ওসি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ক্লু উদ্ঘাটন করা যায়নি। তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে মেহেদী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।
বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. শরীফ শাহাবুর রহমান জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মেহেদীকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তার পরও ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার (রক্ত পরীক্ষা) স্বার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গতকাল বুধবার তাকে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, দীর্ঘ সাড়ে ৪ মাস চোখ-হাত বেঁধে রাখলে তার যেসব শারীরিক সমস্যা হওয়ার কথা কিংবা যেসব উপসর্গ থাকার কথা সেগুলো মেহেদীর মধ্যে নেই। বিষয়টি রহস্যজনক।
উল্লেখ্য, নিখোঁজ হওয়ার ৬ মাস আগে বিএম কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী শারমীন আক্তার রিংকিকে বিয়ে করেন মেহেদী। একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গত বছরের ১৯ নভেম্বর ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। থাকতেন রায়ের বাজার এলাকায় ফুফুর বাসায়। ১ ডিসেম্বর বিকেলে বন্ধু একই গ্রামের সুজন ঘরামির কাছে মেরামত করতে দেয়া একটি ল্যাপটপ আনতে গিয়েছিলেন তিনি। ল্যাপটপ নিয়ে সুজন এবং তার অপর দুই বন্ধু সাফায়াত ও জাইনের সঙ্গে খেতে গিয়েছিলেন বনানীর নর্দান ক্যাফে রেস্তোরাঁয়।

মানবকণ্ঠ/এসএস