১১ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ১৩ ব্যাংক

মৃত্তিকা সাহা:
ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ফলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে ব্যাংক ঋণ। এ ঋণঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। আর ব্যাংকের আয় থেকেই এই প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি খাতের ১৩টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে অর্জিত মুনাফা দিয়েও তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতির মুখে পড়েছে এই ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছরের জুন শেষে ১৩টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ১০ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে সাত ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৯ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ছয় মাসে প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরো ৬টি ব্যাংক। আর ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে এক হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। মোট ঘাটতির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত আয় ছিল না বলেই ঘাটতিতে পড়েছে এসব ব্যাংক। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। এতে নিরুৎসাহিত হন বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে সামগ্রিক প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া। আর খেলাপি ঋণ বাড়ার মূলে রয়েছে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ঝুঁকি পর্যালোচনা না করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণঝুঁকি নীতিমালার অপব্যবহারও করছে ব্যাংকগুলো। এ কারণে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। তারা বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেই প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে। আর ব্যাংকগুলোকে আয়ের খাত থেকে অর্থ এনে এই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ বঞ্চিত হন। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ আমানত গ্রহণ করে তার একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে ব্যাংকিং ভাষায় এসএলআর বলে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ অর্থ রাখা হয়। বাকি অর্থ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু ব্যাংক যাদের কাছে বিনিয়োগ করে তারা ঋণ ফেরত না দিলে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য খেলাপি ঋণের প্রকার ভেদে বিভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হলে ওই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। আর মূলধন ঘাটতি হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই ব্যাংক বছর শেষে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। তবে কয়েক বছর ধরে প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ আনুকূল্যে লভ্যাংশ ঘোষণার অনুমতি পাচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক। আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ঋণের শ্রেণিমান বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। আর নি¤œমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি মানে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে যথক্রমে ২০, ৫০ ও ১০০ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ রয়েছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা মন্দমানে শ্রেণিকৃত। সন্দেহজনক মানে রয়েছে সাত হাজার ১৭৮ কোটি টাকা এবং সাত হাজার ২৩৬ কোটি টাকা নি¤œমানে শ্রেণিকৃত। শ্রেণিমান বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর ৫২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার প্রয়োজন ছিল। কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাখলেও ১৩ ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের ঘাটতির কারণে সামগ্রিক খাতে সংরক্ষণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে সাত হাজার ৯৯০ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
তালিকায় শীর্ষে থাকা সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে বেসিক ব্যাংকে তিন হাজার ২২৩ কোটি, রূপালীতে এক হাজার ৩৭২ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকে ৮৯০ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকে ৪৭৮ কোটি, কমার্স ব্যাংকে ৪২২ কোটি, এসআইবিএলে ৩৬৮ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ১৬০ কোটি, এবি ব্যাংকে ১৪৭ কোটি, প্রিমিয়ারে ১১৬ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্টে ১০৬ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৪৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংকে ২১ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.