হেনরিক যোহান ইবসেন

একজন স্বনামধন্য নরওয়েজীয় নাট্যকার। যাকে সম্মান করে বলা হয় আধুনিক নাটকের জনক। ইবসেন নরওয়ের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার হিসেবে আসীন। তিনি নরওয়ের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছেন বলা যায়। ইবসেন আধুনিক মঞ্চনাটক প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক মূল্যবোধের বিভিন্ন উপাদানকে সমালোচকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে। ভিক্টোরীয় যুগে নাটকগুলো কেবল সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে কথা বলবে এমন ভাবা হতো; যেখানে সত্য সর্বদাই কালো শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে এবং সব নাটকই তৎকালীন সামাজিক মূল্যবোধের গুণগান গেয়ে শেষ হবে। ইবসেন এই ধারার বিপক্ষে যেয়ে নাটকের সমাপ্তিতে বৈচিত্র্য আনেন এবং নতুন ধারার জন্ম দেন। শেক্সপিয়ারের মতো ইবসেনকেও ইউরোপীয় ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নরওয়ের শিয়েন এলাকার সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারে ইবসেনের জন্ম হয়। তার বাবা নুড ইবসেন ও মা ম্যারিচেন অ্যাটেনবার্গ। পনেরো বছর বয়সে ইবসেন ঘর ছাড়েন। ফার্মাসিস্ট হওয়ার মানসে তিনি ছোট্ট শহর গ্রিমস্টাডে আস্তানা গাড়েন এবং এখানেই তার নাটক লেখার সূত্রপাত। তার প্রথম উপন্যাস ক্যাটিলিনা (১৮৫০) একটি বিয়োগান্তক উপন্যাস, যা তিনি Brynjulf Bjarme ছদ্মনামে প্রকাশ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। তবে এই নাটক মঞ্চায়িত হয়নি। তার প্রথম মঞ্চস্থ নাটক হচ্ছে দ্য বুরিয়াল মন্ড (১৮৫০), যা খুব কমই নজর কেড়েছে। তবুও নাট্যকার হওয়ার রাস্তা থেকে ইবসেন পিছু হটেননি। এই নাটকগুলোর পর কয়েক বছরে ইবসেন কিছুই প্রকাশ করেননি।
বার্গেনের একটি নরওয়েজীয় নাট্যগোষ্ঠীতে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর চাকরি করেন। এখানে তিনি ১৪৫টিরও বেশি নাটকে নাট্যকার, পরিচালক এবং প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময়ে তিনি তার নতুন কোনো নাটক প্রকাশ করেননি। নাট্যকার হিসেবে সাফল্য লাভে ব্যর্থ হলেও এই গোষ্ঠীতে তিনি অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছেন যা পরবর্তীকালে তার লেখার কাজে এসেছে। ইবসেন ১৮৫৮ সালে ক্রিস্টিয়ানিয়াতে আসেন এবং ক্রিস্টিয়ানিয়ার জাতীয় থিয়েটারের সৃজন পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৮৬৪ সালে তিনি ক্রিস্টানিয়া ত্যাগ স্বেচ্ছা নির্বাসনে ইতালি চলে যান। ২৭ বছর পর যখন স্বদেশে ফিরেন, ততদিনে তিনি নাট্যকার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন। ১৮৬৮ সালে ইবসেন ইতালি ছেড়ে জার্মানির ড্রেসডেনে গমন করেন। এখানে তিনি তার প্রধান সাহিত্য কর্মগুলো রচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে এমপেরর অ্যান্ড গ্যালিলিয়ান (১৮৭৩), যা রোমান শাসক জুলিয়ান দ্য অ্যাপোস্টেটের জীবন ও সময় নিয়ে নির্মিত হয়েছে। যদিও ইবসেনের মতে, তার সমস্ত নাটকের মধ্যে এটিকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতেন, তবুও অধিকাংশ সাহিত্যিকই তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেন। তার পরের সাহিত্যকর্মগুলো অনেক বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে। ১৮৭৫ সালে ইবসেন মিউনিখে চলে যান এবং এখান থেকে ১৮৭৯ সালে প্রকাশ করেন বিখ্যাত নাটক আ ডলস হাউস। এই নাটকে ভিক্টোরীয় যুগের বিয়েতে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা তুলে ধরেন, যার জন্য তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।
আ ডল’স হাউজের পর ইবসেন লেখেন গোস্টস (১৮৮১), যাতে ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার ধারার উগ্র বর্ণনা ছিল। ১৮৮২ সালে তিনি প্রকাশ করেন অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল। আগের নাটকগুলোতে বিতর্কিত বিষয়াদি গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও তা ব্যক্তিগত অঙ্গনের ভিতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। অ্যান এনিমি ইফ দ্য পিপল নাটকে বিতর্কই প্রধান আলোচ্য বিষয় এবং পুরো সমাজই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী। যে প্রধান বার্তা এই নাটকটির মাধ্যমে দেয়া হয়েছে তা হলো, কখনো কখনো একজন ব্যক্তির মতোই সঠিক হতে পারে যদিও সাধারণ জনতা সবাই ভিন্ন মত পোষণ করে। সাধারণ জনতাকে এখানে মূর্খ ও ভেড়ার পালের মতো তুলনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চলিত ভিক্টোরিয়ান বিশ্বাস, সমাজ একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান এবং সর্বদা বিশ্বাসযোগ্য এই ধারণাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। আজ তার জন্মদিন।
আব্দুল্লাহ আল সিফাত