হিজড়াদের দিকে দৃষ্টি দিন

বছর দেড়েক আগের ঘটনা। সাইন্সল্যাবের মোড়ে গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ চোখ গেল রাস্তার ওপারে। সামান্য জটলা। লক্ষ করলাম লিকলিকে লম্বা গড়নের এক তরুণকে ঘিরে তৃতীয় লিঙ্গের কিছু লোকজনের জটলা। ছেলেটি অসহায় দৃষ্টি নিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। আর কী যেন বলার চেষ্টা করছে।

সম্ভবত পুলিশের সাহায্য কামনা করছে অথবা পথচারীদের সাহায্য। আমি রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়েই লক্ষ করছি সব। তরুণ আমার ছেলের বয়সী; দেখতেও ওর মতো কিছুটা। মায়া ধরেছে তাই। ফলে উৎসুক হয়ে রাস্তার ওপাশে যাওয়ার উদ্যোগ নিলাম।

ওপারে যেতে না যেতেই মিনিট দুয়েকের মধ্যেই জটলা সাফ। এবার ছেলেটি ভদ্র ভাষায় খিস্তি খেউর আওড়াচ্ছে। বিষয়টা জানতে চাইলে সে আমাকে জানায়, হিজড়ার দল ওকে ঘিরে ধরেছে। ওরা পাঁচ-ছয়জন চারদিক থেকে ঘিরে টাকা-পয়সা যা পেয়েছে হাতিয়ে নিয়েছে। যাওয়ার সময় ওর গালে ছোট্ট একটা চুমুর চিহ্ন রেখে গেছে। তাতে সে ভীষণ লজ্জিত। গালে লিপস্টিকের দাগ তখনো লেপ্টে আছে। ছেলেটির পরিচয় জানতে চাইলে বলল, ‘আঙ্কেল আমি কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়েছি, তারপর তো সবই দেখলেন আপনি। এখন বাসায় ফিরব কিভাবে সেটাই ভাবছি।’ বললাম, ‘তোমাকে ওই নিয়ে ভাবতে হবে না। এই সামান্য ক’টাকা রাখ, তোমার গাড়ি ভাড়া হয়ে যাবে।’ ছেলেটি টাকাটা নিতে ইতস্তবোধ করছে। বললাম, ‘এছাড়া তোমার উপায় নেই, রাখ বাবা।’

ছেলেটি অসহায় দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সুযোগে সামান্য ক’টাকা ওর পকেটে গুঁজে দিয়ে আমি দ্রুত সরে পড়লাম। এই হচ্ছে আমার দেখা হিজড়াদের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ছোট্ট একটি ঘটনা। এ ছাড়াও প্রত্যক্ষ আরো অনেক ঘটনার সাক্ষী। শুধু আমি নই, সমগ্র দেশবাসী এ ধরনের অত্যাচারের সাক্ষী। বিশেষ করে রাজধানীর ধানমণ্ডি লেকপাড় এবং উত্তরাবাসীর কাছে রীতিমতো আতঙ্কের নাম হিজড়া সম্প্রদায়।

হিজড়াদের সরকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কয়েক বছর আগে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। যার ফলে ওদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি-বাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও আর বাধা রইল না। এখন যা করতে হবে তা হচ্ছে, হয়তো লেখাপড়া করতে হবে, নচেত কর্মমুখী শিক্ষা অর্জন করতে হবে। অথচ দু’য়ের কিছুতেই তারা উৎসাহী নয়; বরং তারা বেছে নিচ্ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। দেশের যে কোনো স্থানেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে থাকে ওরা। নবজাতকের সন্ধান পেলে দলবল নিয়ে মানুষের বাসায় হাজির হয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। নবজাতককে ছিনিয়ে নিয়ে উপরের দিকে ছুঁড়তে থাকে আর বাবা-মায়ের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজটি করতে থাকে ওরা। এই ধরনের ঘটনায় নবজাতকের মৃত্যুও হয়। পানিতে চুবিয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। যা সত্যিই রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম!

হিজড়া সম্প্রদায় দ্বারা নির্যাতনের ফলে মানুষ কারো কাছে নালিশ জানানোর সুযোগ পায় না। এ ধরনের বিপদে কেউ এগিয়েও আসে না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনকে জানালেও প্রতিকার পাওয়া যায় না, যা আরো দুঃখজনক। এতসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকেরা হালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রকৃতি প্রদত্ত ছাড়াও কৃত্রিম উপায়ে হিজড়া হওয়ার ধুম লেগে গেছে, যে সংবাদটি আমরা প্রায়ই খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই দেখতে পাই।
সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলে এমন ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছেও। অপারেশনের মাধ্যমে হিজড়া হতে গিয়ে কয়েকজন পুরুষ মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দেয়ার খবরে দেশবাসী আতঙ্কিতও হয়েছেন।

এ ঘটনায় প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সুস্থ মানুষজন হিজড়া হতে উৎসাহিতবোধ করছেন? জবাবটা খুব জটিল নয়, চোখ বন্ধ করলেই বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে কোনো মুহূর্তেই। তথাপিও সামান্য খুলে বলছি। যেমন: হিজড়া সম্প্রদায়কে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না এটা সর্বসাধারণের ধারণা। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং খিস্তিখেউরের সুযোগ থাকে যেমনি, তেমনি প্রকাশ্যে দিবালোকে ছিনতাই রাহাজানির সুযোগ পায় ওরা। আবার পুলিশ থেকে যেমনি সুরক্ষিত তেমনি গুণ্ডা-বদমাইশ থেকেও সুরক্ষিত হিজড়া সম্প্রদায়। এতে করে পেশা হিসেবে বেছে নেয়া কিংবা হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পেরে নিরপরাধবোধ করে ওরা। ইত্যাদি সব ভেবেচিন্তে বেকার ভবঘুরে কেউ কেউ অপারেশনের মাধ্যমে হিজড়া হতে উৎসাহবোধ করছে ইদানীং। এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে আবার অর্থলগ্নির ব্যাপার-স্যাপারও। হিজড়াদের গুরুমা দালালের শরণাপন্ন হয়ে সামান্য কিছু অর্থলগ্নি করে দলে লোকজন ভেড়াতে এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন। দালালেরা বেকার ভবঘুরে যুব সম্প্রদায়কে ফুঁসলিয়ে কিছু অসাধু ডাক্তারের মাধ্যমে অপারেশন করিয়ে কৃত্রিম হিজড়ায় রূপান্তরিত করে সামান্য কামিয়ে নেয় সে সুযোগে। যদিও সেই কামানো অর্থ খুব বেশি নয়, কিন্তু সেই নির্মমতায় যে একটি জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না চক্রটি। টের পাচ্ছে না হিজড়ায় রূপান্তরিত হওয়া লোভী মানুষটিও। সে তার দৈহিক রূপান্তর ঘটিয়ে যেমনি সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে, তেমনি অকাল মৃত্যুও ডেকে আনছে, যা মানুষটি বুঝতে সক্ষমও হচ্ছে না। – লেখক: বন্যপ্রাণী বিশারদ

মানবকণ্ঠ/এএএম