হারিয়ে যাচ্ছে বালু নদী

হারিয়ে যাচ্ছে বালু নদী

ঐতিহাসিকভাবে বয়ে যাওয়া রাজধানীর চারপাশ দিয়ে নদীগুলোই যেন ঢাকার লাইফ লাইন। তাছাড়া ঢাকার জনপদকে সুরক্ষিত নাগরিক সভ্যতা গড়ে ওঠার মূলেও এসব নদীর প্রবাহই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। অথচ মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো সব উপযোগিতাই হারিয়ে ফেলেছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে থাকা রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো এখন যেন জনসাধারণের কাজে আসছে না। দিন দিনই যেন জলাবদ্ধতার ভোগান্তি আরো বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নে এসব নদীর পানি স্বাভাবিক গুণাগুণ হারিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে অবাধে চলেছে নদী ভরাট, অপদখল এবং নদী বিনাশী নানান তৎপরতা। যেন নদী দখল ও দূষণের প্রতিযোগিতা চলছে। প্রকৃতির দান রাজধানীর চারপাশে প্রবাহিত এসব নদীর দখল-দূষণ নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব।

শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ধলেশ্বরীর মতো চরিত্র হারাতে বসেছে বালু নদী। রাজধানীর উত্তর-পূর্ব এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বালু নদী। নদীর এক পাড়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, অন্য পাড়ে ঢাকার খিলগাঁও বালুরপাড়। নানা সংকটে নদীর প্রবাহ কমে গেছে। পানি কুচকুচে কালো। এ নদীতে কোনো নৌযান চললেই তৈরি হচ্ছে সাদা ফেনা। কয়েক বছর আগেও এ নদীতে বড় বড় লঞ্চ চলত। এখন নাব্যতা সংকটে তা আর চলতে পারে না। পাশাপাশি দখলের কারণে বিপন্ন হতে চলছে বালু নদী। দখলদারের কবজায় এখন নদীর প্রায় ২২ কিলোমিটার তীরবর্তী এলাকা। এক সময়ের মিষ্টিপানির নদী বালুর বর্তমান অবস্থা এমনই। কোনো কোনো জায়গায় সংকুচিত হয়ে যাওয়া দেখলে মনে হবে যেন কোনো এঁদো ডোবা। স্থানীয় দখলদার প্রভাবশালীদের কারণেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদীটি।

পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এ অবস্থা তৈরি করেছে। রাজধানীর পয়ঃবর্জ্য ও কারখানার বর্জ্য বালু নদীতে ফেলা বন্ধ না করলে এক সময় বালু নদীর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এজন্য এখনই বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এ ছাড়া হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে নদীগুলোর পরিস্থিতির আস্তে আস্তে উন্নতি হবে।

সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ জানান, ঢাকার চারপাশের নদীকে রক্ষা করতে হলে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি নদী রক্ষায় নৌপরিবহন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নতুবা একদিকে উচ্ছেদ চলবে আর অন্যদিকে অবৈধ দখল চলতেই থাকবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভুঁইয়াপাড়া, টেকপাড়া, মেরাদিয়া, ত্রিমোহনী, নাসিরাবাদ, ডুমনি, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও, কাজলা, ইউসুফগঞ্জ, কাঁচকুড়া, কাঁঠালিয়া, ছোলমাইদ, পুলারটেক ও টঙ্গী নদী তীরে অবস্থিত।

জানা গেছে, বালু নদী শীতলক্ষ্যার শাখানদী। রূপগঞ্জের ডেমরা এলাকার শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বালু নদী টঙ্গীতে গিয়ে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিশেছে। বালু নদী থেকে আবার দুটি ছোট নদী নরাই আর দেবধোলাই ঢুকেছে ঢাকায়। এ ছোট নদী দুটি দিয়ে ঢাকার মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, গুলশান, তেজগাঁও, সবুজবাগ, ডেমরা, মতিঝিলসহ বিশাল এলাকার শিল্প ও স্যুয়ারেজের বর্জ্য এসে পড়ছে বালু নদীতে। বছরের পর বছর আবর্জনা পড়তে পড়তে নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে।

ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, বালু নদীর মোট দৈর্ঘ বাইশ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে দৈনিক দশ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য, বর্ষায় ৫৬ কোটি ঘনমিটার বর্জ্য মেশানো পানি, বিভিন্ন শিল্প-কারখানার সাড়ে চারশ’ ঘনফুট বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে পড়ছে। এ ছাড়া বালু, নরাই ও দেবধোলাই নদীর ওপরে আছে সহস্রাধিক ঝুলন্ত পায়খানা। এসব থেকে আরো পাঁচশ’ ঘনফুট পয়ঃবর্জ্য নদীতে মিশছে।

চনপাড়া এলাকার হেলাল উদ্দিন বলেন, নদীতে মাছ না থাকলেও আছে পোকা। নদীতে কত ধরনের যে পোকা তার হিসাব নেই। পোকায় নদীর পানি কিলবিল করে।

নদী তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পচা পানির কারণে বালু নদী তীরের দু-তিন ফসলি জমি এক ফসলি হয়ে গেছে। দূষণের কারণে বালু নদীর পানিতে এখন আর মাছ নেই। মাছ না থাকায় নদীর পাড়ের জেলেপাড়ার বেশিরভাগ জেলে চলে গেছেন অন্য পেশায়। এ ছাড়া নদী তীরের বেশির ভাগ জমি দখলদারদের কবলে। গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসাকেন্দ্র। এসব থেকে মাসে আদায় হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ টাকা। ওইসব দখলদারদের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা সে দলের সমর্থক সেজে যান। দখল-বাণিজ্যর কারণে টঙ্গী রেল এবং ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু এখন ঝুঁকির মুখে। মূলত বালু নদী টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর থেকে শুরু হয়ে ডেমরা পর্যন্ত বিস্তৃত।

জয়নব বেগম (৪২)। বিধবা। ভুঁইয়াপাড়ার বালু নদীর তীরে স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা সামাদের ঘর ভাড়া নিয়ে দুই সন্তানসহ বসবাস করছেন। এখানে এমন ধরনের শতাধিক ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘরের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ৪০টি পরিবার সামাদের হাতে মাস শেষে ৪২ হাজার টাকা তুলে দিচ্ছে। এ ছাড়া বালু নদীর তীরে কয়েকটি খেয়াঘাট রয়েছে। এ খেয়াঘাটগুলো কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ইজারা দিয়েছেন। প্রতি ঘাট থেকে প্রতিদিনের জন্য ২ হাজার টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে।

বালু নদী নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী ও বারোগ্রাম উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি সুরুজ মিয়া বলেন, ঢাকার মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, গুলশান, তেজগাঁও, সবুজবাগ, ডেমরা, মতিঝিলসহ বিশাল এলাকার শিল্প ও স্যুয়ারেজের বর্জ্য এসে পড়ছে বালু নদীতে। বছরের পর বছর আবর্জনা পড়তে পড়তে নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নদীপাড়ের ঢাকা ত্রিমোহনী, লায়নহাটি, নাসিরাবাদ, দাসেরকান্দি, বালুরপাড়, বেড়াইদ, ধীৎপুর, রূপগঞ্জের নগরপাড়া, পশ্চিমগাঁও, কামসাইর, নাওড়া, ইছাপুরাসহ বিশাল এলাকার দু-তিন ফসলি জমি এক ফসলি হয়ে গেছে। এ কারণে বালু নদীর দুই তীরের মানুষের আয় কমে গেছে।

ত্রিমোহনী এলাকার জেলে কিংশুক অভিযোগ করে জানান, দূষণের কারণে বালু নদীতে এখন সারা দিন জাল ফেলেও আর মাছ পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে আমরা ইছাপুরাসহ ১০-১২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে বিল ও খালে মাছ ধরি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বার বার চেষ্টা করেও উচ্ছেদ করা যায়নি দখলদার। বরং সেখানে উচ্ছেদ করতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে পড়তে হয় সরকারি সংস্থাগুলোকে।

নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘আমরা ইকোলজিক্যাল রিস্টোরেশন অব ফোর রিভার নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এ প্রকল্পের আওতায় বালুসহ ঢাকার চারপাশে থাকা চারটি নদ-নদী সম্পূর্ণভাবে দূষণমুক্ত না হলেও আর যেন দূষিত না হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করা হবে। নদী দূষণের সঙ্গে জড়িতদের জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে। ইতিমধ্যেই এজন্য মোবাইল কোর্ট চালু করা হয়েছে।’

মানবকণ্ঠ/এসএস