হারিয়ে যাচ্ছেন পোশাক শিল্পের ছোট উদ্যোক্তারা

ক্ষুদ্র ও মাঝারি তথা এসএমই উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলাদেশে পোশাক খাতের যাত্রা শুরু হলেও এখন এ শিল্পে আর এসএমই উদ্যোক্তা বলে কেউ থাকতে পারছে না। রানা প্লাজা ধস পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এ খাতে ঘটে গেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এতে ছোট উদ্যোক্তারা তাল মেলাতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছেন। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা। রিটেইলার ও সরকারের কাছ থেকে তারা কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে বড় কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বাড়ছে তাদের নতুন নতুন ইউনিট। এর ফলে ধনীরা ধনী হচ্ছেন আর গরিবরা হচ্ছেন গরিব। এমনটিই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের পরে নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১২০০ কারখানা। এর মধ্যে সরাসরি বিজিএমইএর সদস্য ২৭৩টি। প্রায় ৮০টি কারখানা বিকেএমইএর সদস্য। বাকিগুলো এ দুটি সংগঠনের বাইরে ছোট ছোট কারখানা। যারা সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করত। এর মধ্যে গত ৬ মাসেই বন্ধ হয়ে গেছে ৫৪টি কারখানা। গত ঈদের আগে ও পরেও বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার মধ্যে ৩৫টি সরাসরি বন্ধ হয়ে গেছে অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স ও বিজিএমইএর তৃপক্ষীয় কমিটির সিদ্ধান্তে। আর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের পরিদর্শন শুরু হলে এবং তাদের দেয়া শর্ত পূরণ করতে না পেরে নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে প্রায় ৬০০টি কারখানা। বাকি কারখানাগুলো অর্ডার না পাওয়া, শ্রমিক সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা।

এক সপ্তাহ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এমন এক কারখানার নাম লিরিক গার্মেন্টস। অবস্থান রাজধানীর রামপুরায় টিভি ভবনের পাশে। এখানে প্রতিদিন চার হাজার পোশাক তৈরি হতো। কারখানাটির ডিরেক্টর অপারেশন বেলায়েত হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, রানা প্লাজা ধসের পরে নানা কারণেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে বিজিএমইএর মধ্যস্থতায় শ্রমিকদের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করে দিয়ে কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছি আমরা। এখন অন্য কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগের চিন্তা করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বিজিএমইএর পরিচালক মুহাম্মদ নাসিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা কারণে আমাদের জন্য ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রানা প্লাজা ধসের পরে আমাদের ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ (উৎপাদন খরচ) বেড়েছে ১৮ শতাংশ। কিন্তু পোশাকের দাম কমেই চলেছে। বড় উদ্যোক্তারা প্রযুক্তির ব্যবহারসহ কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়ে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য কারখানা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ছোট উদ্যোক্তারা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের শর্ত মেনে কারখানা সংস্কার করতে পারছে না। সেই সক্ষমতা তাদের নেই। এ অবস্থায় এক্সিট করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকছে না।

জানা গেছে, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের দেয়া শর্ত অনুযায়ী গড়ে একেকটি কারখানা সংস্কারে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সিলিং হলো ৫০ লাখ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা। এখন একটি পোশাক কারখানা গড়তে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে শত কোটি টাকার ওপরে। অর্থাৎ এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য এখন আর এই সেক্টর নয়। অথচ এই খাতকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এসএমই উদ্যোক্তারাই। যদিও সেই সময়ের এসএমই উদ্যোক্তারাই এখন বৃহৎ উদ্যোক্তা। কিন্তু নতুন কোনো এসএমই উদ্যোক্তা আর এ খাতে আসতে পারছেন না।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় পোশাক খাতের আরেক সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, নতুন কোনো এসএমই উদ্যোক্তাকে আমরা আর এ সেক্টরে আসতে উৎসাহ দিচ্ছি না। তবে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি সুখকর নয়। কারণ, এসএমই খাত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, একজন ছোট উদ্যোক্তা এখানে এসে ব্যবসা শুরু করে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করতো এবং নিজেদের ব্যবসাও বাড়াত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। এখন শুরুতেই বৃহৎ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। একজন অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য নতুন উদ্যোক্তা এখানে আসছে না। তবে যাদের ব্যবসা আছে তারাই নতুন নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করছেন বলেও তিনি জানান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে মানবকণ্ঠকে বলেন, বড় উদ্যোক্তারা তাদের কারখানার সক্ষমতা বাড়াচ্ছেন, নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠা করছেন, প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াচ্ছেন এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু ছোট ছোট কারখানাগুলোর অবদান আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। তাদেরকে আমরা যদি সাপোর্ট দিতে পারতাম তাহলে হয়তো তারাও ভেলু চেইনের অংশ হয়ে রফতানিতে ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু তা আর হচ্ছে না। আমরা প্রথমে প্রত্যাশা করেছিলাম, রিটেইলার ব্র্যান্ডগুলো ছোট কারখানাগুলোর সংস্কারে সহায়তা করবে। পরবর্তী সময়ে তারা আমাদের হতাশ করেছে। এরপর সরকারের উচিত ছিল স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে এসব কারখানার পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু তাও আমরা দেখতে পেলাম না। তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হতো না। কিন্তু ঋণসহ নীতিগত কিছু সাপোর্ট দিলে তাদের একটি অংশ রফতানিতে ভূমিকা রাখতে পারত।

মানবকণ্ঠ/এসএস

One Response to "হারিয়ে যাচ্ছেন পোশাক শিল্পের ছোট উদ্যোক্তারা"

  1. Pingback: হারিয়ে যাচ্ছেন পোশাক শিল্পের ছোট উদ্যোক্তারা - মানবকণ্ঠ