হাতে হাতে নতুন বই চোখে নতুন স্বপ্ন

বছরের প্রথম দিনটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল পরম আনন্দের। উত্তীর্ণ হয়ে নতুন শ্রেণিতে উঠেছে। শিশু-কিশোররা খালি হাতে স্কুলে গিয়েছে আর নতুন ঝকঝকে তকতকে বই নিয়ে ঘরে ফিরেছে। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে। নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণের উচ্ছ্বাস আর নতুন বই প্রাপ্তির আনন্দ দুয়ে মিলে খুশির বন্যা বয়ে গেছে দেশের প্রতিটি স্কুলে। নতুন বইয়ের সোঁদা গন্ধে মাতোয়ারা হয়েছে শিশু-কিশোররা। কোমল প্রাণের যত স্বপ্ন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নতুন বইয়ের পাতার ভাঁজে।

রাজধানীর আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফটক দিয়ে ঢুকতেই মঙ্গলবার সকালে কানে ভেসে আসে শিশু-কিশোরদের আনন্দের প্রতিধ্বনি। সবুজ মাঠজুড়ে হাজার হাজার শিশু। মাথায় তাদের লাল-সবুজ রঙের ক্যাপ। শিশুদের কলরবে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকরাও। ঢাকঢোল আর ব্যান্ড দলের বাজনা উৎসবকে পুরোপুরি মাতিয়ে দেয়। পাঠ্যপুস্তক উৎসবের কেন্দ্রীয় এ আয়োজন উপলক্ষে রং-বেরঙের পতাকা আর ফুল দিয়ে সজ্জিত করা হয় প্রতিষ্ঠানটির আঙিনা। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু এ অনুষ্ঠানে রঙিন বেলুন উড়িয়ে উৎসব উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের মতোই একই চিত্র ছিল দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখর হয়ে ওঠে কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে।

নতুন বছরের প্রথম দিনে উপহার হিসেবে দেশের সাড়ে চার কোটি শিশুর হাতে তুলে দেয়া হয় ঝকঝকে নতুন পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক উৎসবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদরাও উৎসবে অংশ নেন। নতুন বছরে টানা দশম বারের মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে এবার ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২ কপি বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছে সরকার। এ বছর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য ৫টি ভাষায় বই পাচ্ছে। গত তিন বছর ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই বিতরণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিতরণ করা হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তক উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বছরের প্রথম দিনে সব শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ দুনিয়ার একমাত্র দেশ, যেখানে সব বই বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। জগতে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের এমন উদাহরণ আর নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা এবং আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাছিবুর রহমান। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপিত হবে। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে বিশ্বমানের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি।

শিক্ষার গুণগত মানকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে শিক্ষক-অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের বর্তমানকে উজাড় করে দিতে হবে।

অন্যদিকে সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আনন্দের দিন। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, ২ কোটি ৫ লাখ ৩৭ হাজার ১৪১ জন শিক্ষার্থীকে চার রঙের ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৯৯ হাজার ৮২৪টি এবং প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩৪ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আমার বই এবং ৩৪ লাখ ২৮ হাজার ১০টি অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হবে।

তিনি জানান, দেশের ২৫টি জেলায় ৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাদরী মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রদান করা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, ফেনী, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ