হলুদ সাংবাদিকতা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

হলুদ সাংবাদিকতা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। হলুদ শব্দের কারণে এই পেশা অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর ধাবমান এই অবক্ষয়ের জন্য দায়ী এক শ্রেণীর সাংবাদিক নামধারী কতিপয় অসৎ ব্যক্তি। তাদের অনেকেই বলেন, থাকেন হলুদ সাংবাদিক। সমাজ তাদের ভয় করে। প্রশাসনও এদের ঘাটাতে চায় না। হলুদ সাংবাদিকতা অর্থাৎ সংবাদপত্রের এই অবক্ষয় যথা সময়ে রোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে এ পেশার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। অনেক সময় হলুদ সাংবাদিকতার কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। হলুদ সাংবাদিকরা সংবাদ পরিবেশন করছে বিকৃতিভাবে। আবার কেউ কেউ সংবাদ পরিবেশনের ভয় দেখিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করে সংবাদিক সমাজকে কলঙ্কিত করছে। দ্রুত এদের চিহ্নিত করে প্রতিরোধ করা না গেলে সংবাদপত্র মহাবিপর্যয়ে পড়বে।

কেন এই অবক্ষয় এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যায় দেশের হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র ছাড়া অধিকাংশ সাংবাদিককে কাজ করতে হয় নামমাত্র মূল্যে অথবা বিনে পয়সায়। অনেক সাংবাদিকের অর্থনৈতিক অভাবের কারণে তাদের নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। অর্থের জন্য সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে অসৎভাবে একটি আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। কিছু কিছু সংবাদপত্রের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয়দানকারী টাউট, বাটপার, মতলববাজদের কারণে সাংবাদিকদের প্রতি জনমনে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে। সমাজের অসৎ দুর্নীতিবাজ লোকেরা তখন উক্ত সাংবাদিককে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। তারা উক্ত সাংবাদিককে বাধ্য করে বিকৃতি সংবাদ পরিবেশন করতে অথবা সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত রাখতে।

হলুদ সাংবাদিকতা বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে আমেরিকার দুই সম্পাদক পুলিৎজার-হার্স্ট নাম প্রথমে চলে আসে। তাদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফলে পরিবেশিত বিকৃত সংবাদগুলোই হলুদ সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। হলুদ সাংবাদিকতার জš§ হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াাম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের নিকট মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা হলুদ সাংবাদিকতার বিষয়ে বলেছেন, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপন করা। এ ধরনের সাংবাতিকতায় ভালোমতো গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়নো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকর্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেঙ্কারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি।

ফ্র্যাঙ্ক লুথার মট হলুদ সাংবাদিকতার পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন: সেগুলো হলো সাধারণ ঘটনাকে কয়েকটি কলাম জুড়ে বড় আকারের ভয়ানক একটি শিরোনাম করা। ছবি আর কাল্পনিক নকশার অপরিমিত ব্যবহার। ভুয়া সাক্ষাৎকার, ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে এমন শিরোনাম, ভুয়া বিজ্ঞানমূলক রচনা আর তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ভুল শিক্ষামূলক রচনার ব্যবহার ইত্যাদি।

তবে আমাদের দেশে হলুদ সাংবাদিকের ডালপালা বিস্তার করেছে অনেক। বিকৃত সংবাদ পরিবেশনের চেয়ে বিকল্প উপায়ে অর্থ উপার্জনই এখন হলুদ সাংবাদিকতার মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু সংবাদপত্রের মালিক কিংবা সম্পাদক এই হলুদ শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষক। তারা হলুদদের দ্বারা নিজেরাও যেমন উপকৃত হচ্ছেন তথাকথিত হলুদদেরও অবৈধভাবে টাকা কামানোর রাস্তা করে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রকৃত সাংবাদিকদের চেয়ে হলুদ সাংবাকিদকরা অনেক বেশি প্রভাবশালী। সমাজে তারা দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করছেন। প্রশাসন তাদের ঘাটাতে চায় না। এই হলুদ শ্রেণীর প্রভাবে প্রকৃত সংবাদ প্রেমী মানুষ কোনঠাসা হয়ে পড়ছে।
বর্তমান সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে দেখা যায় অধিকাংশ পেশা নৈতিক অবক্ষয়ের ব্যাধিত জর্জরিত। যেখানে (সাংবাদিকতা) একটি মাত্র সৎ পেশা হিসেবে টিকে থাকা কষ্টকর। আগে সাংবাদিকতায় নিয়োগ দেয়া হতো যোগ্যতার ভিত্তিতে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ সাংবাদিক নিয়োগ পান সম্পাদকদের বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে। অনেক সাংবাদিক রয়েছে কোনো রকমে একটি সাংবাদিকতার কার্ড জোগার করতে পারলে নেমে পড়ে অবৈধ আয়ের উৎসবের সন্ধানে। যারা সৎ এবং নির্ভীক সাংবাদিক তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। যে সাংবাদিক অসাধু পন্থায় সংবাদপত্রে এসেছে তার কাছ থেকে সাধুতা অর্থাৎ সত্য সংবাদ পরিবেশন আশা করা যায় না। যেহেতু তার শুরুটা হয়েছিল অসাধুতা দিয়ে। এভাবেই হলুদ সাংবাদিকতা গ্রাস করছে সংবাদপত্র শিল্পকে। অনেক সময় দেখা যায় একজন সাংবাদিক সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করল কিন্তু সংবাদটি সম্পাদকের স্বার্থের পরিপন্থি হওয়াতে পত্রিকায় ছাপল না। তখন সাংবাদিক বাধ্য হয়ে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকে। অসৎ সাংবাদিকদের পাশাপাশি কিছু কিছু সংবাদপত্রের মালিকও বিভিন্ন মহলে চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা আদায় করে। তখন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন হয় বাধাগ্রস্ত। হলুদ সাংবাদিকতা প্রকট হয়। হলুদ সাংবাদিকতা থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে এবং সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে পেশাগত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সবাইকে একমত হতে হবে এবং হলুদ সাংবাদিকদের চিহ্নিত করে তবে তাদের সাংবাদিক সমাজ থেকে পরিহার করা।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.