হলুদ সাংবাদিকতার স্বরূপ

রুহুল রায়হান:
সংবাদপত্র একটি শিল্প। এ শিল্পের মহান শিল্পী সাংবাদিক। মোট কথা সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সব ঠিক আছে। তবে কথা আসছে কেন? কিছু ত্রুটি-বিচ্চুতি আছে বলেই কথার অবতারণা। আর এ ত্রুটি-বিচ্চুতিময় সাংবাদিকতাই হলুদ সাংবাদিকতা। ইংরেজিতে ইয়েলো জার্নালিজম। সারাবিশ্বে তা তুমুল আলোচিত শব্দদ্বয়। ব্যক্তিগত মত, চিন্তা ও ভাবের মিশ্রণে হলুদ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ দেয়ার চেষ্টা। এ অনেকের চোখে যুতসই না ঠেকতে পারে। না ঠেকাই সহজাত। সবার মত এক হবে না। হয়ও না কখনো। আর হয় না বলেই মহান নেশা ও পেশার সাংবাদিকতায় হলুদ বলে একটি শব্দ ঢুকে যায়। আমরা অনেকেই তাতে ঢুকে মহানতাকে কলুষিত করি। যুগ যুগ ধরে সৃষ্টি হয় হাহাকার। সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার হাহাকার। যেখানে কি না হাহাকার তোলে এনে বিপরীতে হাসি ফুটানোর কথা। সংশ্লিষ্টদের হাহাকারের রব উঠলে মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হবেই। এভাবেই চলছে। ফলে শিল্পটি ধুকছে।
ব্যক্তিগত মত বাদ দিয়ে এবার হলুদ সাংবাদিকতা শব্দদ্বয় নিয়ে চারপাশ কী বলে তার খোঁজ। প্রথমেই আশ্রয় উইকিপিডিয়া। তা বলছে- হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপনকে বোঝায়। এ ধরনের সাংবাতিকতায় ভালোমতো গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকর্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি। এ তো গেল প্রাথমিক সংজ্ঞায়ন। বিস্তারিত জানার চেষ্টা হবে।

যেভাবে এলো
এর পেছনে রয়েছে মজার এক ইতিহাস। সাংবাদিকতায় ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটি এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। দুই ভুবন বিখ্যাত সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম হার্স্টের এক অশুভ প্রতিযোগিতার ফসল হিসেবে। ১৮৮৩ সালে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড নামে একটি সংবাদপত্র কিনেন প্রখ্যাত সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজার। পত্রিকাটির আগের মালিক ছিলেন জে গোল্ড। অন্যদিকে উইলিয়াম হার্স্ট ১৮৮২ সালে দ্য জার্নাল নামে একটা পত্রিকা কিনে নেন জোসেফ পুলিৎজারের ভাই অ্যালবার্ট পুলিৎজারের কাছ থেকে। কিন্তু পরিবারের সদস্যের পত্রিকা হার্স্টের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেননি পুলিৎজার। শুরু হয় হার্স্টের সঙ্গে পুলিৎজারের স্নায়ুযুদ্ধ। পুলিৎজার নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড কিনেই ঝুঁকে পড়লেন চাঞ্চল্যকর খবর, চটকদারি সংবাদ ইত্যাদি প্রকাশে। রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্ট নামে একজন কার্টুনিস্টকে চাকরি দিলেন তার কাগজে। ওই কার্টুনিস্ট ইয়েলো কিড বা হলুদ বালক নামে প্রতিদিন নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রথম পাতায় একটি কার্টুন আঁকতেন এবং তার মাধ্যমে সামাজিক অসংগতি থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছু বলিয়ে নিতেন, যা ছিল অনেকটাই পক্ষপাতদুষ্ট। এক সময় হার্স্ট পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের কার্টুনিস্ট রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্টকে অধিক বেতনের প্রলোভনে নিয়ে এলেন তার জার্নাল পত্রিকায়। হার্স্ট তাতেই ক্ষান্ত থাকেননি, মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের ভালো সব সাংবাদিককেও টেনে নেন নিজের পত্রিকায়। বেচারা পুলিৎজার রেগে আগুন। তিনি অগত্যা জর্জ চি লুকস নামে আরেক কার্টুনিস্টকে নিয়োগ দেন। এদিকে জার্নাল, ওদিকে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড-দুটো পত্রিকাতেই ছাপা হতে লাগল ইয়েলো কিডস বা হলুদ বালক কার্টুন। শুরু হয়ে গেল পত্রিকার কাটতি নিয়ে দুটো পত্রিকার মধ্যে দ্বন্দ্ব। জার্নাল এবং নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের বিরোধ সে সময়কার সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল। দুটো পত্রিকাই তাদের হিট বাড়ানোর জন্য ভিত্তিহীন, সত্য, অর্ধসত্য ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিমূলক খবর ছাপা শুরু করল। এতে দুটো পত্রিকাই তাদের মান হারালো। তৈরি হলো একটি নষ্ট মানসিকতার পাঠকশ্রেণী, যারা সব সময় চটকদার, ভিত্তিহীন, চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী, অর্ধ-সত্য সংবাদ প্রত্যাশা করত এবং তা পড়ে তৃপ্তি পেত। এভাবেই জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম হার্স্ট দু’জনেই হলুদ সাংবাদিকতার দায়ে অভিযুক্ত এবং ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রইলেন।
জোসেফ পুলিৎজারের জš§ ১৮৪৭ সালের ১০ এপ্রিল। অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ্ব থেকে ঊনবিংশ শতকের সূচনালগ্ন পর্যন্ত তিনি ছিলেন একাধারে সফলতম লেখক ও সংবাদপত্র প্রকাশক। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির মাধ্যমে তার আয় করা বিপুল অর্থ ও ধন-সম্পদ তিনি দান করে গেছেন কলম্বিয়া স্কুল অব জার্নালিজমে। বর্তমানে এটি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার ইচ্ছে অনুযায়ী ১৯১১ সালের ২৯ অক্টোবর তার প্রয়াণের পর তার সম্মানার্থে পুলিৎজার পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্রকলা, নাটক, কবিতা, ইতিহাস, পত্র, সঙ্গীতের মতো ২১টি বিভাগে এ পুরস্কার সাংবার্ষিক আকারে দেয়া হয়। হলুদ সাংবাদিকতার সঙ্গে তার নাম জড়িত থাকলেও ১৮৮০-এর দশকে পুলিৎজার নতুন সাংবাদিকতার কলা-কৌশল প্রবর্তন করে বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেন। যা তাকে করেছে অমর। অনেকেই তাকে সাংবাদিকতার পিতামহ বলেও আখ্যায়িত করেছেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে হলুদ সাংবাদিকতা প্রকট আকার নিয়েছে। প্রতিটি অন্ধকার গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে; অর্থাৎ নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার আশ্রয় নিচ্ছেন। ফলে শুরুতেই তা হলুদের পাল্লায় পড়ছে। ফলে আমরা পাচ্ছি গোষ্ঠীগত উদ্দেশ্যমূলক খবর। আবার এক সংবাদপত্র অন্য সংবাদপত্রের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে। কিছু ক্ষেত্রে দুই বা ততধিক এমন সংবাদপত্রের সুনির্দিষ্ট দোষও মিলছে। ফলে সবগুলোই হলুদে রাঙায়িত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি গণমাধ্যমে যা আসছে অন্য গণমাধ্যম তা চেপে যাচ্ছে। একটি গণমাধ্যম বলছে এটি এমন ঘটেছে। অন্য গণমাধ্যম উল্টো বলছে। একটি গণমাধ্যম একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষপাতিত্ব করছে। ঠিক অন্য একটি গণমাধ্যম আরেকটি দলের লেজুরবৃত্তি করছে। এভাবেই হলুদে সয়লাব আমরা। তাইতো শোনা যায় ওই সম্পাদক জঙ্গি এজেন্ট। আরো শোনা যায় তিনি রাজনীতির হাতিয়ার। এও শোনা যায় তিনি সেনা শাসন আনতে চান। ঠিক এও শোনা যায় তিনি বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। এমনও শোনা যায় তিনি সরকারের দালাল। ফলে সরকারি বিদেশ সফরে তিনি থাকবেনই। এভাবেই চলছে। নিন্দুকেরা রাষ্ট্রীয় একাধিক গণমাধ্যম হলুদের বিস্তর চর্চা করে বলেও জানান দেয়। এভাবেই আমরা দেখি নানা অনিয়ম।

কুফল
সাংবাদিকতার নানা অনিয়মের বেলায় সাংবাদিকরা অসংখ্য দলের হয়ে যান। নীতি-আদর্শের বালায় থাকে না। তখন তারা পোষা গোষ্ঠী হয়ে যান। কেউ না কেউ নিজের অপকর্ম ঢাকতে সাংবাদিক বা সংবাদপত্র পোষেন। আর অনিয়মের নানা গোষ্ঠী পোষে গণমাধ্যমকে। ফলে উদ্দেশ্যমূলক খবর প্রকাশ হয়। বিপরীতে আর্থিক সুবিধার নিশ্চয়তা পেলে তা বন্ধ করা হয়। বহুজাতিক একাধিক কোম্পানি জনগণকে চুষে খায়। নিয়মের বালাই ছাড়াই তারা জনগণের ও রাষ্ট্রের সঙ্গে অপরাধ করে। সব জায়েজ করতে গণমাধ্যমকে বিজ্ঞাপন দেয়। অবচেতনে নয় চেতনেই গণমাধ্যম তার গুণগান গায়। চলে অফুরান হলুদ সাংবাদিকতা।

শেষ কথা
যুগে যুগে সময়ে সময়ে গণমাধ্যমে যত আঘাত এসেছে তার জন্য কোনো না কোনোভাবে হলুদ সাংবাদিকতা দায়ী। গণমাধ্যম যখন সংগ্রামের পথ বেছে নেয়, তখন সংশ্লিষ্ট কেউ হলুদের আশ্রয় নেয়াতেই আক্রমণ তীব্র বেগে আসে। সংশ্লিষ্টের পরিধি কিন্তু অসীম। তা খোদ হতে পারেন দেশের তথ্যমন্ত্রী। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও। এভাবেই ৫৭ থেকে ৩২ হয়ে আমরা বসবাস করি। হলুদ সাংবাদিকতায় সৎ সাংবাদিকতা ঢাকা পড়ে। সত্যিকার সাংবাদিক নানা নির্যাতনের শিকার হয়। হলুদেরা ক্যাঙ্গারুর নানা খোপে দিব্যি বসে থাকে। আর গণমাধ্যম ধুকে চলে। আমরা ছুটে চলি নেশা ও পেশার জায়গাটি পবিত্র রাখব বলে। হলুদ এসে তাকে ধর্ষণ করে দিয়ে যায়। এক একজন মোনাজাত উদ্দিন কিংবা সিরাজুদ্দিন হোসেন হারিয়ে যান। বিপরীতে রাজার আশ্রয়ে বহুতল ভবনে অপসাংবাদিকতার বীজ বুনেন কোনো গোলাম। আর নাগরিক জীবনে ক্ষুধা পেটে খবরের পেছনে ছুটেন নাম না জানা কোনো খবরকর্মী। জীবনটা তার কাছে সাক্ষাৎ খবর। কোনো গোষ্ঠীর হলুদ খবর নয়, প্রকৃত ও নির্ভেজাল খবর। একদিন তার স্বপ্নেরা আকাশ ছোঁয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.