হঠাৎ সূচিতে পরিবর্তনে বেকায়দায় বাংলাদেশ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মরুর বুকে ক্রিকেটের ফুল ফুটেছিল। ক্রিকেট বিশ্ব তা ব্যাপকভাবে গ্রহণও করেছিল। মরুর তপ্ত বুকে ক্রিকেট যেন অমৃত সুধা হয়ে এসেছিল। কিন্তু পরে সেখানে নোনা স্বাদ পেতে শুরু করে। একপর্যায়ে মরুর বুক থেকে হারিয়ে যায় ক্রিকেট। পরে পাকিস্তান নিজেদের হোম গ্রাউন্ড বানিয়ে খেললেও দর্শক আর আগের মতো করে ফিরেননি। দর্শকের অভাবে খাঁ খাঁ করতে থাকে। মরুর বুক থেকে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যাওয়ার কারণ ছিল ভারতের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। যে কারণে ভারত ২০০০ সালের পর এখানে আর ক্রিকেট খেলেনি। অবশেষে দীর্ঘ দেড় যুগ পর মরুর বুকে আবার আগের জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্রিকেট ফিরছে সেই ভারতের কারণেই। এশীয় কাপ ক্রিকেটের আয়োজক ছিল ভারত। কিন্তু সেখানে পাকিস্তান খেলতে যাবে না বলে ভারত ভেন্যু সরিয়ে আনে আরব আমিরাতে। এ যেন প্রচণ্ড গরমে পুড়তে থাকা মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টি। দর্শকরা গো-গ্রাসে খাচ্ছেন ক্রিকেট। আগে যেখানে পাক-ভারত ম্যাচ ছাড়া দর্শকে টইট¤ু^র হতো না গ্যালারি, সেখানে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার উদ্বোধনী ম্যাচেই দর্শকে ভরপুর। অধিকাংশই ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দর্শকরা আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রহের সঙ্গে গো-গ্রাসে ক্রিকেট গিললেও নিরপেক্ষতা ফিরে পায়নি মরুর ক্রিকেট। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নতুন করে উঠেছে। আগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। এবার ভারতের বিপক্ষে। অবশ্য এটাকে অভিযোগ না বলে সরাসরি পক্ষপাতিত্বই বলা শ্রেয়! কারণ ভারতকে সুবিধা দিতে গিয়ে সরাসরি নিয়মেই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এবারের এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুবাই ও আবুধাবি এই দুটি ভেন্যুতে। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে ভারত দুবাইয়ে বাইরে গিয়ে কোনো ম্যাচ খেলবে না। গ্রুপ পর্বে ভারতের দুটি ম্যাচ দুবাইতে অনুষ্ঠিত হলেও সুপার ফোরে গিয়ে আর সে সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না! কারণ গ্রুপ পর্বে কোন দল কী অবস্থানে থাকবে তা আগাম বলা সম্ভব ছিল না? গ্রুপ পর্বের অবস্থানের কারণে ভারতের কোনো ম্যাচ আবুধাবিতে হতে পারে। সেখান থেকে ভারতকে উদ্ধার করার জন্য মঙ্গলবার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটে রাতারাতি পরিবর্তন আনা হয়েছে। যা রীতিমতো দৃষ্টিকটু। ‘বি’-গ্রুপে বাংলাদেশের অবস্থান যাই হোক না কেন বাংলাদেশিকে দেখানো হয়েছে বি-২। তার মানে বাংলাদেশ যদি আজ আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় হয় তাহলে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে ঠিকই। কিন্তু তাদের গণনা করা হবে বি-২ দল হিসাবে। এদিকে দুই গ্রুপে দুটি করে ম্যাচের পর সুপার ফোর নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচ দুটি শুধুই নিয়ম রক্ষার ম্যাচে পরিণত হয়েছে। নতুন নিয়মের কারণে ‘এ’ গ্রুপে ভারত এ-১ এবং পাকিস্তান-২ এবং ‘বি’ গ্রুপে আফগানিস্তান বি-১ এবং বাংলাদেশ বি-২ হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে সুপার ফোরে ভারতের সব ম্যাচই রাখা হয়েছে দুবাইতে। বাংলাদেশসহ বাকি দুই দল শুধু ভারতের বিপক্ষেই ম্যাচ খেলবে দুবাইতে। নিজেদের বিপক্ষে দুটি করে ম্যাচ খেলবে আবুধাবিতে। যে গন্দমের কারণে মরুর বুক থেকে ক্রিকেট হারিয়ে গিয়েছিল, সেখানে নতুন করে ক্রিকেট ফিরে আসলেও গন্দম রয়ে গেছে। এর ফলাফল এই মুহূর্তে বলা না গেলেও অদূর ভবিষ্যতে কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে! তবে বিষয়টিকে মোটেই ভালোভাবে নিতে পারেননি বাংলাদেশের দলপতি মাশরাফি। তিনি এ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে রীতিমতো হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আইসিসির একাডেমি মাঠে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন চলছিল একদিকে, আর আরেকদিকে সাংবাদিকদের মাশরাফি বলেন, ‘অবশ্যই এটা হতাশার। প্রথম থেকেই আমাদের পরিকল্পনায় ছিল যে আমরা শ্রীলঙ্কাকে প্রথম ম্যাচে হারাতে পারলে আমরা হয়তো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে এগিয়ে যাব। এরপর গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে ‘এ’ গ্রুপ রানার্সআপ দলের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ খেলব সুপার ফোরে। কিন্তু আজকে (হবে গতকাল) সকাল থেকে জানতে পারছি, আমরা আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিতি আর হারি, আমরা ‘বি-২’ হয়ে গেছি। এটা অবশ্যই হতাশার।’ হঠাৎ করে এ রকম পরিবর্তনর ফলে মাশরাফিকে আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হচ্ছে। ভাবতে হচ্ছে নতুন করে। কিন্তু নতুন সূচি নিয়ে তিনি এখনো ভাবার সুযোগ পাননি বলে জানান। মাশরাফি বলেন, ‘সূচি বদল নিয়ে চিন্তা করার সুযোগই পাইনি।’

হঠাৎ এ রকম পরিবর্তনে মাশরাফিকে বেশ ভাবাচ্ছে। এটি তাদের জন্য বাড়তি প্রেসার বলেও মনে করছেন তিনি। এর কারণ সুপার ফোরের ম্যাচ। এশিয়া কাপের আগের তিন আসরের মাঝে দুই আসরেই বাংলাদেশ ফাইনাল খেলেছে। যদিও একবারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এবারো ফাইনাল খেলার জোর দাবিদার এবং শিরোপা প্রত্যাশী। যে কারণে সুপার ফোরের প্রতিটি ম্যাচই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফাইনালে খেলবে পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুই দল। আসর শুরু হওয়ার আগে মাশরাফি বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ফাইনালের পথেও তার কাছে সুপার ফোরের প্রথম ম্যাচ একইরকম গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু সেখানে তিনি আরব আমিরাতের ৪০ ডিগ্রির উপরের তাপমাত্রায় বিশ্রাম নেয়ার জন্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় পাচ্ছেন। আজ আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলেই তার পরের দিন দুবাইতে এসে খেলতে হবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। এই দুই ভেন্যুতে যাতায়াতে সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো। ছোট্ট করে একটিা গাণিতিক হিসাব দেয়া যায়। সিডিউল সময় অনুযায়ী খেলা শেষ হবে রাত সোয়া এগারটায়।

আগে ব্যাটিং করা দল কম রানে অলআউট না হলে সিডিউল সময়ে খেলা শেষ হাওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। ম্যাচের পর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মাঠ থেকে বের হতেই বেজে যাবে রাত প্রায় ১টা। হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা। এরপর ঘুমানোর সময় কোথায়? ঘুমাবেই বা কখন, আর সকালে উঠবেই বা কখন। কাজেই অল্প সময় ঘুমিয়ে আবার উঠে পড়তে হবে ম্যাচ খেলার জন্য। সুপার ফোরে একমাত্র বাংলাদেশই কম বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে জানান মাশরাফি। তাপমাত্রার বিবেচনায় এটা খুবই কঠিন বলে মাশরাফির মন্তব্য। তিনি বলেন, ‘সুপার ফোরের ম্যাচের আগে একটা দিন বিশ্রাম পেলে ভালো হতো। আমরা ১২ ঘণ্টা সময়ও পাব না রিকোভারি করার জন্য।

আর যদি আমরা আগামীকালের (আজ) ম্যাচে পরে ফিল্ডিং করি আর নেক্সট (সুপার ফোরের প্রথম ম্যাচ) ম্যাচে আগে ফিল্ডিং করি এটা আমাদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যাবে।’ যে কারণে মাশরাফি কি করবেন বুঝে উঠতে পারছে না। আফগানিস্তানেরে বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে ভাববেন, না ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে ভাববেন। এ নিয়ে তার মাঝে বিরাজ করছে অস্থিরতা। এ নিয়ে তার কথা, ‘এখন সত্যি বলতে আফগানিস্তান ম্যাচ নিয়ে ভাবনা যতটুকু ছিল সেটি তো আর নেই। এখন ২১ তারিখের ম্যাচের পরিকল্পনাই বেশি করতে হচ্ছে। আবার একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে চিন্ত করব না, সেটাও হয় না। সব মিলিয়ে অস্থির অবস্থায় আছি আমরা।’

মানবকণ্ঠ/এএএম