সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের নানা উদ্যোগ

‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়/আড়ালে তার সূর্য হাসে’- সেই আড়ালের আলোর প্রত্যাশায় স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর রাষ্ট্র যন্ত্রকে বিরাট এক ধাক্কা নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর রাজধানী অচল করে টানা বিক্ষোভ দেখায় শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও উত্তেজনার মধ্যেই ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। ফিটনেসবিহীন ও বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোসহ সড়কে নিয়ম ফিরিয়ে আনতে ‘ট্রাফিক পুলিশ সপ্তাহ’ পালিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে কুর্মিটোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে সান্ত¡না ও তাদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনটি নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। প্রস্তাবিত আইনে, বেপরোয়া গাড়িতে কারো মৃত্যু হলে চালকের পাঁচ বছর জেল হবে। কেউ গুরুতর আহত হলে একই সাজা ভোগ করতে হবে। তবে পুলিশের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় চালক উদ্দেশ্যমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। ফিটনেসবিহীন ও বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোসহ সড়কে অন্য নিয়ম ভঙ্গের সাজাও বেড়েছে নতুন আইনে। তবে মৃত্যু উপত্যকা সড়কে প্রাণহানি রোধে আরো কঠোর আইন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, আগের আইনে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর সাজা ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড। নতুন আইনে ৩০৪ (খ) ধারায় সাজা দুই বছর বাড়বে। এ ধারায় জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। তবে তদন্তে যদি তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয় উদ্দেশ্যমূলক হত্যা তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারণ করবেন বিচার ৩০২ না ৩০৪ (খ) ধারায় হবে।

খসড়ায় সাজা দুই বছর বাড়লেও একে যথেষ্ট মনে করছেন না নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিকের স্বার্থই রক্ষা করা হয়েছে। নামের বিচারেই ‘সড়ক পরিবহন আইন’ যথার্থ হয়নি। এটি হওয়ার কথা ছিল ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’। তিনি বলেন, আইনে বলা হয়েছে, হত্যা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেটা হবে তদন্ত সাপেক্ষে ৩০২ ধারায়। এটা কি আমাদের দেশে আদৌ সম্ভব? ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো কেউ যদি মারা যায়, তাহলে ৩০২ ধারায় যাবে। সাধারণ মানুষ তো ওই জায়গায় যেতে পারবে না। রংপুরের একজন শ্রমিক মারা গেলে কেউ ৩০২ ধারায় নেবে? আসলে সুচিন্তিতভাবে মানুষকে ঠকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আইনে। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ৬ মাসের জেল, আর নকল লাইসেন্স ব্যবহার করলে ২ বছরের জেল। এটা কী ধরনের কথা? তাহলে কে নকল লাইসেন্স দেখাবে, সে তো ধরা পড়লে লাইসেন্স ছুড়ে ফেলে দেবে। আইনে থাকা বৈষম্যগুলো দূর করা জরুরি বলে মনে করেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

সড়ক পরিবহন আইনে খুশি নন মালিক-শ্রমিক নেতারাও। তারা বলছেন, সাজা অনেক বেশি কঠোর হয়ে গেছে। এত কঠিন সাজা মাথায় নিয়ে পরিবহন খাত চলতে পারবে না। সড়ক পরিবহন সংগঠনের নেতারা বলছেন, চালকরা গলায় ফাঁসির দড়ি নিয়ে সড়কে যানবাহন চালাবেন না। তারা আইনটিকে স্বাগত জানাচ্ছেন না।

প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ দেখছে বিএনপি। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আইন ‘যথেষ্ট’ হবে বলে তারা মনে করছেন না। প্রস্তাবিত আইনে দুর্বৃত্ত ও গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। এটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। তিনি বলেন, এই আইন গণপরিবহনে নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আদৌ সংসদে এটি পাস হবে কিনা তা নিয়ে নাগরিকরাও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দায়ী চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর বাড়িয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড করা হয়েছে। কিন্তু রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল মৃত্যুদণ্ড।

কয়েকদিনের টানা ছাত্র বিক্ষোভের পরে গতকাল মঙ্গলবার কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের প্রাণ চাঞ্চল্যের দেখা মিলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। স্কুল কলেজের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আবারো বাড়তে শুরু করেছে। ক্লাস টেস্ট, মডেল টেস্ট ও অন্য পরীক্ষাও যথারীতি হয়েছে। অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, সড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ক্লাসে উপস্থিতি আরো বাড়বে। কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবশ্য জানান, অভিভাবকদের মধ্যে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, ছাত্রছাত্রীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের ফোনে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হয়েছে। সপ্তাহান্তে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির হার শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে পুলিশের সঙ্গে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ‘মতবিনিময়ে’ ডেকেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিকেল ৩টায় এই মতবিনিময় সভা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ওই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এর আগে ৫ আগস্ট ঢাকা মহানগরীর সরকারি বেসরকারি স্কুল কলেজের প্রধানদের নিয়ে সভা করে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি।

উল্লেখ্য, আন্দোলনের নবম দিন সোমবার রাজধানীতে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের মধ্যে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় দুই দিন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন এবং আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.