স্যানিটেশন ও পানির ভয়াবহ সংকটে রোহিঙ্গারা

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে টয়লেট, স্যানিটেশন ও পানি সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এক মাসের মধ্যেই নলকূপগুলোর প্রায় ৩০ ভাগ এবং টয়লেটগুলোর ২৪ ভাগই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নলকূপের সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। প্রায় ২০-২৫টি পরিবারের জন্য রয়েছে একটি নলকূপ। অন্যদিকে, ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টয়লেট না থাকায় বেশ অসুবিধার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় এসব সমস্যা সৃষ্টিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করা ১০ লাখের বেশি (পুরনো রোহিঙ্গাসহ) রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে প্রতিমুহূর্ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে পানির জন্য। খাওয়ার পানির যেমন তীব্র অভাব এখানে, তেমনি রয়েছে গোসল, ধোয়াপালার পানির অভাবও। তবে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন

প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীর বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনভূমিতে ৪ হাজার ৩৭০টি নলকূপ স্থাপন করে। তাতেও পানীয় সংকট কাটেনি বিপুলায়তন এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। তার ওপর এক মাস যেতে না যেতেই এসব নলকূপের ৩০ ভাগ অকেজো হয়ে পড়েছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। ক্যাম্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও একই কথা বলছেন। একইভাবে প্রথম দিকে উখিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ে যত্রতত্র অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের কুতুপালং ও বালুখালীর মূল ক্যাম্পে সরিয়ে নেয়ায় সেখানকার নলকূপগুলো এখন অব্যবহৃত হয়ে আছে।

রোববার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়, কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৪ হাজার ৩৭০টি নলকূপ স্থাপন করা হলেও তাদের ৩০ ভাগই প্রায় অকেজো অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, ২৪ হাজার ৭৭৩টি টয়লেটের ৩৬ ভাগই ব্যবহারের অনুপোযোগী।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে (নতুন অনুপ্রবেশকারীসহ) প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার স্যানিটেশন নিশ্চিত করার লক্ষ নিয়ে কাজ করলেও এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৩০ রোহিঙ্গার স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে পেরেছে বলে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, পর্যাপ্ত টয়লেট ও ম্যানুয়েল ওয়াটার পাম্পের অভাবে রোহিঙ্গাদের স্যানিটেশন ও পানীয় অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিশুদ্ধ খাবার পানির পাশাপাশি ব্যবহারের পানিরও রয়েছে তীব্র সংকট। ক্যাম্পে বসবাসকারী সারী শিশুরা কুয়া, খাল ও খালের পাশে গর্ত করে খাবার ও ব্যবহারের পানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর ওই পানির জন্যও দীর্ঘ লাইন করে তীব্র রোদে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে তাদের।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এখনো স্যানিটেশন সমস্যা প্রকট আকারে রয়েছে। ক্যাম্পের ঝুপড়ি ঘরের পাশে গর্ত করে রাতের আঁধারে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে। শিশুরা যখন তখন যত্রতত্র খোলা যায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করছে। এতে দিন দিন পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে, দুর্গন্ধে ভারি হয়ে উঠছে পরিবেশ।

প্রায় প্রতিদিনই শত শত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের কারণে ক্যাম্পগুলোতে টয়লেট ও পানি ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। টয়লেট ও নলকূপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গার (পুরনো রোহিঙ্গাসহ) পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির উন্নতি না হওয়ায় সংকট চরম আকার ধারণ করছে। জাতিসংঘ আন্তঃবিভাগ সমন্বয় গ্রুপের ওয়াসা ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার কারণে টয়লেট উপচে পড়ায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়েছে। এমতাবস্থায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে একই অবস্থা দেখা যায়। একেকটি নলকূপ ঘিরে আছেন ৩০-৪০ জন নারী-পুরুষ এবং রোহিঙ্গা শিশু। কেউ গোসল করছেন, কেউ কেউ হাড়ি-পাতিল ধোয়ার জন্য ব্যস্ত। শিশুরাও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কখন বড়রা সরে যাবে এই সুযোগের অপেক্ষায়। এখানে একেকটি অগভীর নলকূপ ব্যবহার করেন ২৫ থেকে ৫০টি পরিবার। নলকূপে গোসল করতে আসা রোহিঙ্গা আবদুল মালেক (৫০) জানান, এখানে এখন প্রধান সমস্যা পানির। পাহাড়ের পাশে একটা ছোট খাল থাকলেও সেখানে অনেকগুলো টয়লেটের বর্জ্য গিয়ে পড়ে। তাই সে পানি ব্যবহার করা যায় না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই একটি নলকূপের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। খাবার পানিও এখান থেকে নিতে হয়।

মিয়ানমারের মংডুর সিকদারপাড়া থেকে আসা সাফিয়া বেগম (৪০) স্বামীর সঙ্গে ৫ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এপারে এসেছেন। তিনি জানান পানির জন্য, খাদ্যের জন্য এত যুদ্ধ কতে হবে তা কখনো ভাবিনি। পানির সংকটের কারণে দুই-তিনদিন পরপর এখন গোসল করতে হয়। নলকূপের কাছে এসে যে দীর্ঘ লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয়, তাতে সংসারের অন্যকাজগুলো পড়ে থাকে। তাছাড়া মাঝেমধ্যে ত্রাণের জন্যও লাইনে দাঁড়াতে হয়। তাই এখন নিয়মিত গোসলও করতে পারছি না। এসেছি আধাঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে, এখনো গোসল করার সুযোগই পাচ্ছি না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যেসব নলকূপ বসানো হয়েছে, এক মাস যেতে না যেতেই ৩০ ভাগ নলকূপই এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, হয়তো ৫০/১০০ টাকার একটি ছোট্ট যন্ত্রাংশের জন্য পুরো কলটিই অব্যবহৃত হয়ে আছে। সামান্য একটা নাটবল্টু বা একটি ওয়াসার নষ্ট হয়ে গেলে এখানে কেউ দায়িত্ব নিয়ে কলটি মেরামত করে না। এভাবে অকেজো হয়ে আছে শত শত

এ প্রসঙ্গে কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পের ইনচার্জ (যুগ্মসচিব) মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘অনেকগুলো নলকূপ অকেজো হয়ে আছে একেবারে ছোটখাটো কিছু ত্রুটির কারণে। এ বিষয়ে রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপাট্রিয়েশন কমিশনকে (আরআরআরসি) কেউ যদি দায়িত্ব দেয়, তাহলে সবগুলো নলকূপ রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস