স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসুন

আজ ১৪ জুন, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিগত ২৩ মে, ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৮তম অধিবেশনে এ দিবসটিকে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের ঘোষণা এবং তা বিশ্বব্যাপী পালন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতিসংঘের ১৯২টি সদস্য দেশগুলোর জনগণের মধ্যে রক্তদান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, তাদেরকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যাতে করে বিশ্বব্যাপী রক্তের চাহিদা পূরণ করা যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে

এবারের প্রচারণার বিষয় হচ্ছে ‘Blood donation as an action of solidarity’ অর্থাৎ ‘রক্তদান হচ্ছে সংহতি প্রকাশের মাধ্যম’ এবং এ বছরের বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের স্লোগান হচ্ছে ‘Be there for someone else. Give blood. Share life. বাংলায় বলা যায় ‘অন্যের পাশে দাঁড়ান, রক্ত দিন, জীবন বাঁচাতে শরিক হোন’- এ বাণীর মাধ্যমে মানুষের মৌলিক গুণাবলীসমূহ যেমন পরোপকার, দয়া এবং সহমর্মিতার প্রকাশকে আলোকিত করা হয়েছে যাতে করে জনগণ একে অন্যের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসে, এর মাধ্যমে সমাজের পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় এবং একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ একক সমাজ গড়ে ওঠে।

১৯০১ সালে রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘এবিও’ ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার (জন্ম ১৮৬৮, মৃত্যু ১৯৪৩)। তার এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রক্ত পরিসঞ্চালন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ আবিষ্কারের জন্য তাকে মেডিসিনে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এরপরে তিনি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ‘রেসাস’ ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন ও অন্যান্য ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কারেও ভূমিকা রাখেন। এ জন্য তাকে রক্ত পরিসঞ্চালনের জনক বলা হয়। তার এসব অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তার জন্মদিন ১৪ জুনকে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।

জানা প্রয়োজন যে, আপনার বয়স যদি ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হয়, আপনার ওজন যদি ৪৫ কেজির উপরে হয়, আপনি যদি নিজেকে সুস্থ মনে করেন, তা হলেই আপনি প্রতি ৩/৪ মাস অন্তর এক ব্যাগ করে রক্ত দান করার জন্য উপযুক্ত। রক্তদানে শরীরের কোনো ক্ষতি তো হয়ই না, বরং অনেক উপকার পাওয়া যায়। তাছাড়া রক্তদানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের আয়তন পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। রক্তের প্লাজমা বা রক্তরস পূরণ হয় ২ দিনে, আর রক্তের লোহিত কনিকা পূরণ হয় ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে, যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রক্তদাতাকে ৩-৪ মাস অন্তর রক্ত দিতে বলা হয়।

পৃথিবীতে এখন প্রতি বছর ১১ কোটি ২৫ লাখ ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয় যার প্রায় ৫০ ভাগ সংগৃহীত হয় অধিক আয়কারী দেশগুলোতে যেখানে মাত্র ১৯ ভাগ লোক বাস করে। পক্ষান্তরে অন্য ৫০ ভাগ সংগৃহীত হয় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে যেখানে প্রায় ৮১ ভাগ লোক বাস করে। উন্নত দেশে রক্তদাতার সংখ্যা প্রতি হাজারে ৩৩ জন এবং অনুন্নত দেশে মাত্র ৪ জন প্রতি হাজারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগামী ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীর সব দেশেই স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের সংখ্যা ১০০%-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ৬২টি দেশে ১০০% স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের রক্ত ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের দেশে বছরে প্রায় নয় লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে সাত লাখ ব্যাগ। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে শতকরা একজন লোক যদি বছরে এক ব্যাগ করে রক্ত দান করে, তবে বছরে ১৬ লাখ ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হতে পারে। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে মোট সংগৃহীত রক্তের ৭০ ভাগই আসে আত্মীয়-স্বজনদের থেকে এবং মাত্র ৩০ ভাগ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা থেকে। অনাত্মীয়দেরকে কে রক্ত দেবে? আমাদের প্রয়োজন এই ৭০ ভাগ আত্মীয় রক্তদাতাকে স্বেচ্ছায় রক্তদাতায় রূপান্তর করা। রক্তের প্রয়োজন তো প্রতি নিয়ত, প্রতিদিন। তাই রক্তের ঘাটতি পূরণের জন্য সক্ষম রক্তদাতাদের এগিয়ে আসতে হবে।

অসচেতন জনগণের মধ্যে এখনো রক্তদান করার চাইতে রক্ত ক্রয় করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যদিও রক্তের ক্রয়-বিক্রয় ‘নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন-২০০২’ এবং ‘নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিধিমালা-২০০৮’ মোতাবেক দণ্ডনীয় অপরাধ, তথাপি কিছু কিছু অসাধু রক্ত ব্যবসায়ী সরকারি নজরদারির আড়ালে রক্তের ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত। মনে রাখা দরকার- ক্রয়কৃত রক্ত সাধারণত পেশাদার রক্তদাতাদের- যারা মাদকাসক্ত এবং নানা রকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত, অর্থাৎ তাদের রক্ত মানোত্তীর্ণ নয়। তাই সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে, সক্ষম জনগোষ্ঠীকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে হবে।

আসুন, এই বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সারাদেশে রক্তদানের জন্য বর্ণাঢ্য র‌্যালি, ক্যাম্পেইন, কর্মশালা, পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ, রক্তদান কর্মসূচি, ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং প্রভৃতি কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করি এবং জনসচেতনতা জাগিয়ে তুলি। সন্ধানী, মেডিসিন ক্লাব, রেড ক্রিসেন্ট, বাঁধন, কোয়ান্টাম, লায়ন্স ক্লাব, রোটারি ক্লাবসহ আরো নতুন নতুন সংগঠনের মাধ্যমে দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সবাইকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করি, স্বেচ্ছায় রক্তদানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সচেষ্ট হই এবং ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে শতকরা ১০০ ভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদান নিশ্চিত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভূমিকা রাখি। তাহলে আমরা অচিরেই অন্যান্য অনেক উন্নত দেশের মতো রক্তে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হব এবং তখন কাউকেই আর রক্তের অভাবে মরতে হবে না। লেখক : বিভাগীয় প্রধান, রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ, আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

মানবকণ্ঠ/এএএম