স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মহিলা সিট

সুরাইয়া নাজনীন
ব্যস্ততা বাড়ছে নগরে। চলছে লাল-সবুজ বাতির পাল্লা। দিন বাড়ার সঙ্গে পাবলিক বাসের আসল পরিচয় পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নারীরা! ভিড় বাসে উঠতে না দেয়া, উঠতে পারলেও কথিত ভদ্র সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃঢ়তা। এ যেন নিয়মিত নাটক। বাসের কন্ডিশন ভালো কিন্তু মহিলা সিট? কেউ কি একবার ভেবেছে এই জায়গাটি নারীর জন্য স্বাস্থ্যকর কিনা? এদেশের গণপরিবহনের বেশিরভাগ মহিলা সিট ইঞ্জিনকাভারের ওপর। দিনের পর দিন এখানে বসে অতিরিক্ত তাপ শোষণে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ শারীরিক সমস্যা। তবুও চলে ওই সিটটির জন্য অক্লান্ত যুদ্ধ-

আমরা বলি সম-মর্যাদার কথা। বলি নারী-পুুরুষে বৈষম্যহীন সমাজের কথা। কিন্তু নারীদের জন্য জীবনটাকে সহজ করার প্রকৃত কাজটি করি না। বাসে ‘মহিলা সিট’ বা সংরক্ষিত আসনগুলো সাধারণত ইঞ্জিনবক্সে, চালকের পাশে বা পেছনেই থাকে। সেটা কোনোভাবে সঙ্গত নয়। কারণ আসনগুলো এমন অদ্ভুত উঁচু জায়গায় হওয়া উচিত নয় যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা অসুস্থ মানুষের পৌঁঁছাতে, বসতে, নামতে কষ্ট হয়। আর ইঞ্জিনবক্সের সিটগুলো এতই গরম যে, তাপের জন্য সেখানে শীতকালেও বসা দায়। সংরক্ষিত আসনগুলো প্রকৃতপক্ষে বাসের প্রথম দুই-তিন সারির আসনেই থাকা উচিত।
আমাদের পরিবহনগুলো প্রকৃতপক্ষে, কোনো নিয়মনীতির ধার ধারে না। সিটিং বাসগুলো দিন কয়েক পেরলেই আর সিটিং থাকে না। যতক্ষণ পা ফেলার জায়গা আছে, ততক্ষণ বাসে ‘বাদুড় ঝোলার’ যাত্রী তোলা চলতেই থাকে। তাছাড়া আছে ভিড়ের মধ্যে যৌননিগ্রহের ভয়, ব্যাগ থেকে ফোন, টাকা-পয়সা চুরির ভয়। ফলে মহিলারা সিংহভাগ ক্ষেত্রে বাসে উঠতেই পারে না। অফিস সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় বাসে উঠতে। দেশের উন্নয়নে নারীরাও অন্যতম সহযোগী। সুতরাং এসব সমস্যার বিহিত হওয়া জরুরি।
গণপরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখার আইনটি করা হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। কিন্তু সেই আসন নিয়ে যেন পুরুষ জাতির নানামুখী বিতর্কিত মন্তব্যের শেষ নেই। যেমন- যদি বাসের কোথাও লেখাযুক্ত স্টিকার না থাকে তাহলে সেখানে তো মহিলা বসার প্রশ্নই ওঠে না। আর লেখা থাকলেও চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নারী সহযাত্রীদের দেখেও ঘাপটি মেরে বসে থাকেন। যেন তিনি কিছুই জানেন না। ভাবখানা এমন, এই সংরক্ষিত সিটখানায় উনি রাজত্ব পেয়ে গেছেন। তবে রাজত্ব পেলেও ওই সিটখানাই যে একদিন বিপদ ডেকে আনতে পারে সে খবর কে রাখে?
মহিলা সিটের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কথা বললেন গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সানজিদা হুদা সুইটি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের গণপরিবহনের মহিলা সিটগুলো বেশিরভাগই ইঞ্জিনকাভারের ওপর। সেখান থেকে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয় আর ওই জায়গাতে দিনের পর দিন নারীরা বসে যাওয়া-আসা করাই তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তো অবশ্যই আছে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য এই জায়গাটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। অতিরিক্ত তাপ শরীরে লক হতে থাকে আর আঘাতটি অনাগত সন্তানের ওপর পড়ে। অনেক সময় মিসকারেজ হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায় আবার ব্রেন হ্যামারেজ হওয়ারও ভয় থাকতে পারে। তাই এই সময়টিতে গর্ভবতী মায়েরদের ওই জায়গাটি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। গর্ভবতী মা ছাড়াও অন্য কারোর জন্যও সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত তাপের কারণে চর্ম রোগ, হিট স্ট্রোক, মাসল পেইন, ডিহাইড্রেশন এসব সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাছাড়া কাজের উদ্যম কমে যাওয়া, মানসিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।’

স্কয়ার হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহানা মোবিন বলেন, ‘মহিলা সিটের এই জায়গাটি এত ছোট পরিসরে তার ওপর আবার ইঞ্জিন কাভারের ওপর সেজন্য এটি মেয়েদের জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়। আবার অনেক বাসে এই সিটগুলো এত ওপরের দিকে থাকে যে ওঠানামা করাও বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে। গর্ভবতী মায়েদের জন্য তো স্বাস্থ্যঝুঁকি বটেই তাছাড়া নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাড় ক্ষয় হতে থাকে তাই অতিরিক্ত তাপ শোষণে তাদের ক্ষতিটা বেশি হয়। সেজন্য এই জায়গাটি আসলেও স্বাস্থ্যকর নয়।’