স্বাধীন মতপ্রকাশের অন্তরায় নয় কি

বিশ্বজিত রায় :
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়েছে। একটি বাদ দিয়ে অন্যটিতে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে মুক্ত চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে হুমকির মুখে। যে ধারা নিয়ে এত আলোচনা সমালোচনা সেই ধারা পরিবর্তন করে ডিজিটাল মোড়কে আরেকটু উন্নতি সাধন অর্থাৎ ‘বেশি কথা বলিলে মুখ সিলগালা করে দেব’র পথ অনুসরণ করা হয়েছে। সবার আপত্তির মুখে সমালোচিত ধারাটি কাট করে অন্য আরেকটি সুবিধাজনক জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে কেবল। যেখানে ধারা নম্বরটিরই শুধু পরিবর্তন হয়েছে আর বর্ণনা রয়ে গেছে প্রায় একই রকম। যদি ফরমালিনমুক্ত ফল খেতে গিয়ে ফরমালিনযুক্ত বিষক্রিয়া হয় তাহলে ফরমালিনযুক্ত ফলই ভালো। অর্থাৎ পূর্বের ধারায় যেসব মুক্ত ও স্বাধীন কণ্ঠরোধক কথা রয়েছে বর্তমান পাসকৃত ধারায় সেরকম কিছু থাকলে পরিবর্তনের কি প্রয়োজন ছিল। এই লোক দেখানো পরিবর্তন হাওয়া নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাসের বদলে দম বন্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত হওয়ার পথ বাতলে দেয়া হয়েছে। পাস হওয়া এই আইন গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সচেতন মানুষকে খুশি করতে পারেনি। কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিয়ে ব্যথা আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বর্তমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভেতর বাহির বাস্তবতায় মনে হচ্ছে হাত বাঁধারত অবস্থায় খেতে দেয়া বৈকি। কাউকে হাত বেঁধে ভাত খেতে দেয়া হলে সে হয়তো উচ্ছিষ্টভোজী প্রাণীর মতো কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে পারবে। কিন্তু হাতকড়ায় হাত বাঁধা নিরূপায় মানুষটি কি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হবে। দিন দিন হাত বাঁধার কঠিন কসাঘাতে হয়তো একদিন অকাল প্রয়াত হবে মানুষটি। তখন এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে চারপাশের মানুষ জেগে উঠবে, জানাবে ধিক্কার। শুধু স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণে কারো এমন কাজ করা ঠিক হবে না। অনর্থক একটা বৃহৎ অংশকে ক্ষেপিয়ে তুলে কোনো লাভ নেই। এক্ষেত্রে এমন পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন যেখানে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। যদি কেউ সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙে ফেলে তাহলে যে সর্প দংশনে নিজেকেই ছটফট করতে হবে।
হালের ডিজিটাল বাস্তবতায় নিশ্চয়ই কঠিন আইনের প্রয়োজন আছে। ডিজিটাল সুযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর ধূর্ত সুযোগসন্ধানী উগ্রবাদী মানুষ যেভাবে মিথ্যাচার, বানোয়াট, বিভ্রান্তির মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে তাতে শাস্তি নিশ্চয়তা আইন অবশ্যই দরকার। যারা সর্বদা ডিজিটাল অপকর্মে লিপ্ত আছে তাদের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতভাবে কাম্য। কিন্তু আইন জারি করে সর্বপোরী মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করা হলে তা হবে সরকারের জুলুমবাজিতা প্রদর্শন। সদ্য পাসকৃত আইনের মাধ্যমে মুক্ত মতের বিরোধিতা করলে সেটা হবে অগণতান্ত্রিকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ব্যাপারে সরকারকে সবার মতামত নেয়ার পাশাপাশি সেই মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইনটি পাস করানো উচিত ছিল বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন একটি আইন পাস করা কারো কাম্য ছিল না। এর মাধ্যমে নির্বাচনমুখী এই সময়টাতে আলোচনা সমালোচনার দ্বার উšে§াচন করা হল। গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হলো সমালোচিত বিষবাষ্প।
বিভিন্ন মহলের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ৩২ ধারা বহাল রেখে জাতীয় সংসদে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ পাস করা হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিল পাসের খবর পেয়ে বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদসহ গণমাধ্যম মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন-অ্যাটকোরসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই ব্যাপক সমালোচিত তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা আরো বিশদ আকারে যুক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানানো হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, প্রস্তাবিত ওই আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। পাস হওয়া বিলের কয়েকটি ধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও ৩২ ধারাসহ বেশিরভাগ ধারা বহাল রয়েছে। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য এই আইন নয়। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা যেন না থাকে সেটা এই আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। এদিকে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব উত্থাপনকালে বিরোধী দলের সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বিলে স্টেকহোল্ডারদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। বাকস্বাধীনতার জন্য এটা উদ্বেগজনক। এটা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিল। গণমাধ্যমের উদ্বেগ ও মতামত উপেক্ষা করাই স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধার সৃষ্টি করবে। দেশে সুশাসনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল এই বিলের কারণে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিরাপত্তাহীনতার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে জানিয়েছেন ক্ষুুব্ধ প্রতিক্রিয়া। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘এই আইনটি স্বাধীন গবেষণা ও মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক ভয়ংকর বাধা। এ আইন পাস করার আগেই সম্পাদক পরিষদ ও নাগরিক সমাজের যে অভিমত নেয়া হয়েছিল, সেগুলোর প্রতি সম্মান দেখালে সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো। বিভিন্ন দিক থেকে এই আইনটি সম্পর্কে যে আপত্তি উঠেছিল, সেগুলোও মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সব নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার নামে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হলো। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের যেটুকু পরিবেশ ছিল তা এই আইনে ব্যাপকভাবে খর্ব হবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। স্বল্প মেয়াদে সুবিধা অর্জনের জন্য সরকার যদিও এটা করেছে, কিন্তু আমি মনে করি এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটা হয়তো সরকার এখন অনুধাবন করতে পারছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে এটা তাদের জন্যও আত্মঘাতী হবে।’ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘আমরা এমন একটি কঠোর ও কঠিন আইন চেয়েছিলাম, যার মাধ্যমে অপসাংবাদিকতা, অপপ্রচার, গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার রোধ হবে। কিন্তু আমরা এখন ৩২ ধারা যুক্ত যে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ পাস হতে দেখলাম, তা আমাদের জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়েছে।’ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমার নিজের ওয়েবসাইট হ্যাক করে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। এই অপপ্রচার রোধের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে যে আইনটি পাস করা হলো তার কয়েকটি ধারা নিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে ৩২ ধারায় গণমাধ্যমের স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে ওই ধারা বাদ দেয়ার দাবি তোলা হয়। ব্যাপক সমালোচনা হয়।’ [সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২০.০৯.২০১৮]
সদ্য পাসকৃত এই আইন সব মতবাদকে অস্বীকার করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে চরমভাবে হেয় করা হয়েছে। কোন রাষ্ট্রে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই না থাকে তাহলে ওই রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই অগণতান্ত্রিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যায়। আমরা বারবার গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে মুখে ফেনা তুলছি এ আইনের মাধ্যমে সেই গণতন্ত্রের গায়ে কুঠারাঘাত করা হয়েছে কি না সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজন ছিল। বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় অবশ্যই ডিজিটাল আইনের পক্ষপাতি সুস্থ চেতনার মানুষরা। এই আইনের কিছু কিছু জায়গায় যে বিধান যুক্ত করা হয়েছে তাতে অপরাধীদের হাতে হাতকড়া পড়াবে এটা ইতিবাচক সর্বজন গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ৫৭’র বদলে ৩২-এ যেভাবে বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে তাতে সমালোচনার ভীতকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে বিশেষ করে গণমাধ্যমের হাতে বেশ শক্ত হাতকড়া পড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উত্থাপিত বিলের ৩২ ধারা নিয়ে সাংবাদিকমহলের সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল। ৩২ ধারায় সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
একজন সাংবাদিক সংবাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে যে কোনো ধরনের গোপনীয় কায়দা অবলম্বন করবে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে সেই পথ কঠিনভাবে রুদ্ধ করা হয়েছে। ধরেন কোনো অপরাধীর গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি তাকে বলা হয় আপনি দুর্নীতি করেছেন, আমি এসেছি আপনার দুর্নীতির সেই তথ্য নিতে, অনুগ্রহ করে বলুন কোথায় কিভাবে কার কাছ থেকে আপনি ঘুষ খেয়েছেন। তাহলে কি ওই দুর্নীতিবাজ কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে তার দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য দেবে না ঘার ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেবে। অপরাধ জগতের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে যদি অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে অপরাধকেই জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা সেটা সত্যিই ভাবনার বিষয়। যেমন হাওর দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট আমার একটি লেখায় দুই পিআইসিওয়ালা পলাতক চেয়ারম্যান-মেম্বারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট নানা কথা বলা হয়েছে। তারা হাওর ডুবে যাওয়া কৃষকের করুণ বাস্তবতায় পাশে দাঁড়ানোর বিপরীতে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো এই চেয়ারম্যান-মেম্বার যদি দুর্নীতিই নাই করত তাহলে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল কেন? এখন কি কোন সাংবাদিক এদের অনুমতি নিয়ে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারপর পত্রিকায় লেখালেখি করবে না যা সত্য তাই লেখবে। এভাবে আইন জারি করে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রচার শক্তিকে বেঁধে ফেলে অপরাধ ও অপরাধীকে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।