স্থায়িত্ব ও সুদূরপ্রসারী সেবা দিতে চায় ‘ডিনেট’

ডিনেট২০০১ সালের কথা। তখন কয়েকজন যুবক চিন্তা করে কিভাবে মানুষকে সেবা দেয়া যায়। যাতে দেশের প্রতিটি অসহায় মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে। আর সেটা যেন না হয় গতানুগতিক পদ্ধতিতে। যেন হয় দ্রুত। এর ফল হয় যেন স্থায়িত্ব ও প্রসারিত। শুধু তাই নয়, দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী সেবা দেয়া যায়। এসব ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ডিনেট’। এ বিষয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও অনন্য রায়হান।

>> ডিনেট সম্পর্কে বলুন?

ডিনেট হচ্ছে একটি সলিউশন ডিজাইন ইন্সটিটিউশন। অর্থাৎ এমন কিছুর সামাজিক সমস্যার সমাধান করা যা একটি বড় গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে। আর এই সমাধানগুলো প্রযুক্তি সম্পর্কিত। এই প্রতিষ্ঠানটি সোসাইটি এন্টারপ্রাইজ বা সামাজিক উদ্যোগ। এটার মানে হচ্ছে আমরা যখন কাজ করি তখন যেন উদ্যোগটা সফল হয় ও নিয়মিত জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে পারি। এটা থেকে অর্থসংস্থানের সুযোগ হয়। যাতে প্রকল্পের অর্থ বন্ধ হয়ে গেলেও কাজ চলতে থাকে।

>> আপনার সঙ্গে ডিনেটের সম্পর্ক?

ডিনেটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন আমি। পড়াশোনা করেছি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর। দেশে আমি কাজ করেছি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউশন ডেভেলপমেন্ট অব স্টাডিজ ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে যখন ছিলাম তখন ডিনেটের ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত।

>> প্রতিষ্ঠানটির শুরুর কথা?

ডিনেটের জন্ম ২০০১ সালে। তবে এর জন্মের আগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। এসময় একটি প্রবাসী বাংলাদেশি গ্রুপের সঙ্গে আমার পরিচয়। যার নাম ‘টেক বাংলা’। তাদের শ্লোগান ছিল Technology not aid for bangladesh। যার অর্থ বাংলাদেশিদের জন্য সাহায্য না প্রযুক্তি দরকার। এই গ্রুপটি একটি রিসার্চ করতে বাংলাদেশে আসে। ওই রিসার্চের নেতৃত্ব দেই আমি। এতে তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কিত অনেক ব্যক্তি অংশ নেয়। যেমন কায়কোবাদ, জাফর ইকবালসহ আরো অনেকে। রিসার্চের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে একটা কনভেনশন হয় ২০০০ সালের ডিসেম্বরে।

ওই গবেষণা করার সময় আমাদের মনে হয়েছে বাংলাদেশে উন্নয়ন ক্ষেত্রে এমন কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই যারা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। এরপর ফাহিম মাশরুর, আনিস চৌধুরীদের নিয়ে ডিনেটের জন্ম হয়। শুরু থেকে আমরা চেয়েছি এমন কাজ করতে যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা মডেল বানাব, যে মডেলটা আমরা অনুসরণ করে বাংলাদেশে বড় আকারে কাজ করব। ইতিমধ্যে এমন একটি কাজ হয়েছে। সেটা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার যা সরকার তৈরি করে, তবে ডিনেটের ‘পল্লি তথ্য’ মডেল অনুসরণ করে করা হয়। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশে বড় আকারে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া ডিনেটের আরেকটি মডেল হচ্ছে ‘স্মার্ট ক্লাস রুম’। যেখানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে শিক্ষা দেয়া হয়। যাতে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম করা হয়েছে।

dnet>> সেবা সম্পর্কে তথ্য?

আগেই বলেছি আমরা স্থায়িত্ব ও সুদূরপ্রসারী সেবা দিতে চাই। যাতে প্রকল্পের অর্থ বন্ধ হয়ে গেলেও যেন সেবাগ্রহীতাদের কাজ চলতে থাকে। আমাদের একটি সেবা রয়েছে ‘আপনজন’ নামে। এটি আমরা শুরু করি ২০১২ সালে। গর্ভবতী মা ও তার পরিবারে সদস্যদের জন্য এটি। সেবাটি দেয়া হয় গর্ভাবস্থার শুরু থেকে বাচ্চা জন্মের এক বছর হওয়া পর্যন্ত। এই সেবার আওতায় আমরা প্রতি সপ্তাহে তাদের কাছে দুটি বার্তা পৌঁছায়। সেটা টেক্সট বা ভয়েস ম্যাসেজে হোক। গর্ভবতী মা যে সপ্তাহে অবস্থান করছেন সে সময়ে তার করণীয় কি সে সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হয়। এই পরামর্শ শুনে যাতে তিনি নিজের ও বাচ্চার যত্ন নিতে পারেন। এছাড়া তিনি যদি কোনো সমস্যায় পড়েন তাহলে ফোন করে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা আমাদের নম্বরটি হচ্ছে ১৬২২৭। ‘আপনজন’র মাধ্যমে আমরা এখন পর্যন্ত ২০ লাখ মানুষকে সেবা দিয়েছি। এটা এই চার বছরের পরিসংখ্যান। এখন চেষ্টা করছি প্রতি বছরেই যেন ২০ লাখ মাকে সেবা দিতে পারি। ‘আপনজন’ বর্তমানে ইউএস এইডের অর্থিক সহায়তায় চলছে।

অপরদিকে আমরা ‘কল্যাণী’ প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। এর মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পণ্য দিয়ে সেবা দিচ্ছে ডিনেট। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রায় সাত লাখ নারীদের বিভিন্ন সেবা দিয়েছি। এরপর আমরা স্কুলে ১৫শ’ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি নম্বরের ভেন্ডর হিসেবে আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করছি।

আমাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে ‘জাংশন’ নামে। এটা মূলত তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য। আমরা চাই আমাদের উদ্যোক্তারা শুধু দেশে না দেশের বাইরেও যেন ব্যবসা করতে পারে। আর সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে গবেষণা করছি কৃষকদের সহায়তা দেয়া নিয়ে। তাদের কিভাবে সেচের ক্ষেত্রে সহায়তা দেয়া যায়। যেমন তাদের ক্ষেতে সেন্সর বসানো থাকবে, যার মাধ্যমে ক্ষেতে কখন এবং কতটুকু সেচ দিতে হবে তা যানতে পারবে কৃষকরা।

>> আর্থিক সহায়তা কোথা থেকে আসছে?

আমরা দেশের বাইরে, আবার দেশের মধ্যে থেকে অনুদান পাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আর্থিক কোনো সহায়তা নেই। তবে কাজের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহায়তা পাচ্ছি। আর বিদেশ থেকে সাধারণত অনুদান পাচ্ছি বাঁচাও নামে একটি সংগঠন, সিএলপির মাধ্যমে। দেশের মধ্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে সহায়তা আসছে।

সবশেষে বলতে গেলে, ‘ডিনেট’ সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে মানুষের সেবায় কাজ করতে। তাই আমাদের তৃপ্তি ও পূর্ণতা তখনই হবে যখন প্রত্যেক মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।

মানবকণ্ঠ/জেডএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.