স্কাই ট্র্যাকার ও দোজা এলানের গল্প

স্কাই ট্র্যাকার ও দোজা এলানের গল্প

এখন পর্যন্ত অনেক মানুষকে বোঝাতে পারি না, আসলে আমার কাজ কি? আমি কি ধরনের কাজ করি। মাঝে মাঝে অনেক আপন মানুষেরও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, আসলে আমার কাজ কি? সমস্যা এই পেশার; কারণ পেশাটা আমাদের দেশে খুব বেশি পরিচিত ছিল না। আমি যখন শুরু করেছি তখন হাতে গোনা কিছু মানুষ এ পেশা সম্পর্কে জানতো। আমাদের কাজ কি, আমরা কি ধরনের কাজ করি, কাদের নিয়ে কাজ করতে হয়, কতক্ষণ কাজের টাইম এসব জানাতেই আমাকে কতকিছু করতে হতো। এক সময় আমার পরিবারের মানুষেরাও আমাকে বলা শুরু করে, আমি কি করি? আমার এই পেশা নিয়ে আমি কতদূর যেতে পারব। ধীরে ধীরে সব কিছু পরিস্কার হয়ে যায়। আমার পথচলা একদিকে মসৃন হতে থাকে আর পরিবারের মানুষেরাও বুঝতে শুরু করে আমার ব্যবসা, কাজের ধরন। বর্তমানে ব্যবসা এবং পারিপার্শ্বিক দিক থেকে বিটিএল ব্যবসার সম্প্রাসরণ ঘটেছে। দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর বেশি সাপোর্ট দরকার হয়। তাই এ ব্যবসার যেমন প্রসার ঘটেছে, আবার কাজ করা মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক কোম্পানি। দেশে বিটিএল ব্যবসা ও ক্যারিয়ার, পেশা এবং স্কাই ট্র্যাকারের কাজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নিবার্হী দোজা এলান সঙ্গে কথা বলেছে নাজমুল হক ইমন

স্কাই ট্র্যাকার ও দোজা এলানের গল্পশুরুর গল্প
আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। তবে আমার যাওয়া আসা ছিল চারুকলাতে, টিএসসিতে। তখন থেকে আমার চিন্তা ছিল আমি ক্রিয়েটিভ কিছু করব। নিজে নিজে চেষ্টা করতাম সেট বানানোর, ডিজাইন করার। আবার ছোট ছোট অনেকে ইভেন্টে কাজও করতাম। সেখান থেকেই আমি মনোযোগী হই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দিকে। ঝোঁক বাড়তে থাকে দিনের পর দিন। পড়াশোনা শেষ করে আমি এই পেশাতে আসব ভেবেছি এবং এসেছি। তাই কাজ শুরু করি ১৯৯৬ সালে রিফ্রেক্ট মিডিয়া কমিউনিকেশনে। এর পর কাজের সুযোগ হয় ২০০০ সালে মিডিয়া কমে। সেখানে কাজ করেছি ৪ বছর। ২০০৫ সালের জুনে আমি মিডিয়া কম ছেড়ে চলে আসি বিটপি এরপর ২০০৬ সালে বিটপির নতুন উইংস স্পটলাইট শুরু হয় আমার হাত দিয়ে। আমি সিইও হিসাবে সেখানে যুক্ত হই। ২০০৬ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সেখানে কাজ করি। এক সময় চিন্তা করলাম আর কত? এখন নিজেদের কিছু একটা করা উচিত। তাই হুটহাট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি নিজেদের একটা কোম্পানি হোক। এরপর আমি আর আমার তিন বন্ধু তৈরি করে ফেলি নিজেদের প্ল্যাটফর্ম স্কাই ট্র্যাকার। আমাদের প্রথম ক্লায়েন্ট ছিল গেইন, সিটিসেল, কিউবি। এরপর কাজের দক্ষতা আর সক্ষমতায় স্কাই ট্র্যাকারের প্ল্যাটফর্মে আসতে শুরু করে আরো অনেক দেশি বিদেশি কোম্পানি। এরপর শুরু এগিয়ে চলা।

স্কাই ট্র্যাকারের ৭ বছর
২০১১ সালে শুরু হয় আমাদের পথচলা। চলছে ২০১৮ সাল। সাত বছর পার করছে স্কাই ট্র্যাকার। এর মধ্যে অনেকেই আমরা সাপোর্ট দিয়েছি। এ ছাড়া আমাদের ক্লায়েন্টের তালিকায় আছে নেসলে, স্যামসাং, ইউনিলিভার, গ্রামীণফোন, সেভ দ্য চিলড্রেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, জিআইজেড, রহিমআফরোজ, ফিলিপ মরিস, সিটি ব্যাংক, বাংলালিংকসহ দেশী-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কাজ করছি। আবার কয়েকটি বিদেশি দূতাবাসের কাজ করা হয়। স্কাই ট্র্যাকার খুব বড় কোম্পানি নয় আবার খুব ছোট কোম্পানিও নয়। ৪ জন থেকে কোম্পানিতে এখন ৪০ জনের বেশি অফিশিয়াল স্টাফ। আর খন্ডকালীন কর্মীর সংখ্যা অনেক।

বিলো দ্য লাইন (বিটিএল) মাকেটিং সম্পর্কে বলুন
বিলো দ্য লাইন (বিটিএল) প্রথাগত বিপণন যোগাযোগব্যবস্থা (বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড) যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় ভিন্ন ধারার এই যোগাযোগ। এসব আসলে বিজ্ঞাপনেরই নতুন ধরন। রেডিও-টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো এখন গুরুত্ব দিচ্ছে নতুন ধরনের এসব কার্যক্রমের। যা মূলত অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা হয়। শুধু তাই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো এখন ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থাও গড়ে তুলছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশীয় বিজ্ঞাপনশিল্প এখন বেশ বৈচিত্র্যময়।

বিলো দ্য লাইন (বিটিএল) মাকেটিং সম্পর্কে আরো জানতে চাই
বিজ্ঞাপনের বাইরেও কীভাবে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানো যায় সে চিন্তা থেকেই আসে বিটিএল। এর আওতায় পড়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টিভেশন, এইচআর ম্যানেজমেন্ট। দেশে অসংখ্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ৩০-৪০টি। বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর প্রায় সবারই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান আছে। বিটিএলের আওতায় দেশে বছরে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাজ হয়। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান যে সব অনুষ্ঠান আয়োজন করে তার কিছু করে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানও। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের প্রচারণার দিকটি দেখে। এ ছাড়া দেশে এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হচ্ছে ডিজিটাল মিডিয়া । যদিও এর যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়, তবে এর পরিধি দ্রুত বাড়ছে। কারণ দেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশে এখন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা শুধু অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।

স্কাই ট্র্যাকার ও দোজা এলানের গল্প

নিজের সম্পর্কে জানতে চাই
গান শোনা আর ভ্রমণ করতে ভালো লাগে আমার। নতুন নতুন বিষয় আর অ্যাডভেঞ্জার সব কিছুই আমার পছন্দের বিষয়। কাজ করতে আমার ভালো লাগে। তবে সব সময় কাজ করি না। প্রতিদিন গড়ে ৬ ঘন্টা কাজ করি, যেটুকু কাজ করে একেবারে সে কাজে মনোযোগ দিয়েই কাজ করি। স্ত্রী-সন্তানকে কাজের পর যতটুকু পারি সময় দেই। এছাড়া ব্যক্তিগত কাজে আমি সময় কমই নষ্ট করি। ১৯৮৮ সালে আমি এসএসসি পাশ করি ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে এরপর ১৯৯০ সালে জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৯৩ সালে জাতীয় ইউনির্ভাসিটি থেকে বিকম (কর্মাস) এবং ১৯৯৫ সালে জাতীয় ইউনির্ভাসিটি থেকে এমকম (মানেজমেন্ট)। আমি খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না আবার খারাপও ছিলাম না। কিন্তু ক্রিয়েটিভ দিকে আমার বরাবরই ঝোঁক ছিল সেটার ফলই আমার আজকের এই অবস্থান।

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আর কি বলবো। আশার তো আর শেষ নেই। আমি আরো এগিয়ে যেতে চাই। আর সবাই যাতে আমাকে ভালোবাসে যে সব কাজ করতে চাই। স্কাই ট্র্যাকার নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে কিন্তু এখন কিছুই প্রকাশ করতে চাই না। এতটুকুই বলবো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বক্সতে বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে যেগুলো বাস্তবায়ন করার কাজ দিনের পর দিন করে যাচ্ছি।

এই পেশাতে যেমন ক্যারিয়ার
ক্যারিয়ার সব পেশাতেই ভালো। এই পেশাতে যারা আসতে চায় তাদের জন্য প্রথমে দরকার ধর্য্য। কারণ আগে শিখতে হবে। শেখার কোনো শেষ নেই। যত শিখবে, যত জানবে আর কাজের অভিজ্ঞতা যত বাড়বে তত লাভ। কারণ এই পেশার অন্যতম মাধ্যম পরিচিতি। যার যত পরিচিতি তার তত ব্যবসা। ক্যারিয়ার গড়ে তোলা যেমন সহজ আবার এই পেশাতে একবার মনযোগ এসে গেলে ভালো লাগা শুরু করবে। আমি বলবো যারা এই পেশাতে আসতে চায় তারা চিন্তা করেই আসতে পারেন তবে ভবিষ্যৎ ভালো। বেতনও কাজের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে কাজের সময় কাজের উপর নির্ভর করে।

স্কাই ট্র্যাকার ও দোজা এলানের গল্পনতুনদের জন্য পরামর্শ
আমার পরামর্শ একটাই সততা। আর কাজে করতে হবে মনোযোগ দিয়ে। কাজের সময় কাজ, কাজ আর কাজ। এই পেশা সকাল ৮টা সন্ধ্যা ৬টার পেশা নয়। সারাদিনই কাজ করা লাগতে পারে প্রয়োজনে। তাই যারা এই পেশাতে আসতে চায় বা এই ধরনের ব্যবসা করতে চায় তাদের জন্য পরামর্শ ব্যবসা করতে হলে আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। সময় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে এবং ক্লায়েন্টকে প্রাধান্য দিতে হবে। না বলে কোনো কথা নেই। মনোযোগ আর সাহস নিয়ে কাজ শুরু করলে এক সময় নতুনরা ভালো করবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক ফ্রেসার ছেলে মেয়ে কাজ করতে করতে দক্ষতা অর্জন করেছে এবং পরবর্তিতে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে। এখন অনেকেই ভালো করছে। তারা স্কাই ট্র্যাকারে সর্বোচ্চ দিয়েছেন তার ফলেই সেই অভিজ্ঞতা নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগছে।

দেশে এই ব্যবসার ভবিষ্যৎ ও প্রতিযোগিতা
আমাদের দেশে বিটিএল ব্যবসার ভবিষ্যৎ খুব ভালো। আগে কোম্পানি বেশি ছিল, বিটিএল ব্যবসার কোম্পানি কম ছিল তাই কাজ করা সহজ ছিল কিন্তু এখন খুব কঠিন ও চ্যালেঞ্জ। কাজ করে নেবার প্রতিষ্ঠান যেমন আছে ঠিক কাজ করে দেবার প্রতিষ্টানও অনেক আছে। তাই প্রতিযোগিতা বাজার বেড়েছে। ছোট ছোট অনেক কোম্পানিই খুব ভালো করছে। আগামীতে আরো কিছু কোম্পানি হয়তো কাজ শুরু করবে তারও ভালো করবে। ভালো কাজ যারা করবে তারাই ঠিকে থাকবে, আর অন্যরা ঝড়ে যাবে। তবে ফোকাস থাকতে হবে নতুনত্বের দিকে, নতুন কি ধরনের সার্পোট দিয়ে কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে নেয়া যায়। কেননা যাদের দিয়ে ব্যবসা তারা ঠিকে থাকলে নতুন পুরনো প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তা টিকে থাকবে। ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকবে।

আগামীতে কতটুকু ক্রিয়েটিভ হবে প্রতিষ্ঠানগুলো
আগামীতে আরো অনেকে প্রতিযোগিতা বাড়বে। কারণ দিন দিন এই ব্যবসাতে যেমন ক্রিয়েটিভিটি যোগ হচ্ছে, সঙ্গে ক্লায়েন্টদের চাহিদাও বাড়ছে কোম্পানিগুলো তাদের নিয়ে কত ভালো কাজ করতে পারে। যে কাজে তাদের ব্যবসার প্রসার হবে, বাড়বে সুনাম এবং জনপ্রিয়তা মানুষের দোরগোরায় পৌঁছাবে। যাদের ক্রিয়েটিভ আইডিয়া ভালো, কাজের কমেন্টমেন্ট ভালো এবং সময় সম্পর্কে সচেতনা আছে তারাই ভালো করবে। ব্যবসা ভবিষ্যৎ ভালো, তবে আজ যেভাবে ব্যবসা হচ্ছে আগামীতে এভাবে ব্যবসা হবে না। পরিবর্তন সব সময় হয়। আগামী পাঁচ বছর বা দশ বছরের পর পরবর্তন তেমনই হবে, ট্রেন্ড তখন যেভাবে থাকবে সেভাবে।

মানবকণ্ঠ/ইএন