সৌহার্দ্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দু’দেশের পতাকা নামানো হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে

ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ঠিক ৫টা ১৫ মিনিট। তার আগেই বেনাপোল চেকপোস্ট নোম্যান্সল্যান্ডের গ্যালারি দর্শক ভর্তি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা মার্চপাস্ট করে এসে দাঁড়িয়ে যান নোম্যান্সল্যান্ডের জিরো পয়েন্টে।

এর পর শুরু হয় মার্চপোস্ট। বিউগলের সেই মধুর সুরে বাংলাদেশ ও ভারতীয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় দুই দেশের জাতীয় পতাকা নামানো বা ‘ফ্ল্যাগ ডাউন’-এর আনুষ্ঠানিকতা। এরপর দুই দেশের নোম্যান্সল্যান্ডে বিজিবি- বিএসএফের সদস্যরা সৌহার্দপূর্ণ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে করমর্দন করেন। চলে মাত্র আধঘণ্টা। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে রিট্রেট সেরেমনি শেষ।

বলছিলাম বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টের প্রতিদিনকার চিত্রের কথা। এটিকে বলা হয় রিট্রেট সেরেমনি। এ রিট্রেট সেরেমনি দেখতে প্রতিদিন দুই সীমান্তের শত শত বাংলাভাষাপ্রেমী এখানে ভিড় করেন। তবে বিজিবি-বিএসএফ’র কঠোর নজরদারির ফলে দিনের বেলা দর্শনার্থীরা নোম্যান্সল্যান্ডে যেতে না পারলেও বিকেলের পতাকা নামানোর এই নয়নাভিরাম দৃশ্য সবার জন্যই উš§ুক্ত করে দিয়েছে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। মাত্র আধা ঘণ্টার এ রিট্রেট সেরেমনি অনুষ্ঠানটি দুই বাংলার মিলনমেলায় পরিণত হয়। বন্ধ হয়ে যায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্যসহ দু’দেশের মধ্যে পাসপোর্ট যাত্রীদের চলাচল।

যশোরের শার্শা, নাভারন, ঝিকরগাছা, বাগাআঁচড়া ও সাতক্ষীরা কলারোয়া থেকে প্রতিনিয়ত যেমন দর্শনার্থী আসেন রিট্রেট সেরেমনি উপভোগ করতে তেমনি ভারতের বনগাঁ, চাঁদপাড়া, মসলন্দপুর, চাকদা এলাকা থেকে আসেন দর্শনার্থীরা। এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় তারা বেনাপোল নোম্যান্সল্যান্ডকে বেছে নিয়েছেন। দু’দেশের পতাকা নামানো, ওঠানো এই মনোরম দৃশ্য দেখে তারা মুগ্ধ হন। বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক দেখে তারা পুলকিত হন। অনেক সময় এখানে দু’দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে করে নিয়ে আসেন শিক্ষক, শিক্ষিকারা। দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খান বিজিবি-বিএসএফ’র সদস্যরা।

ভারতের পেট্রাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, কলকাতাসহ উত্তর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অধিকাংশ মানুষের পূর্ব পুরুষদের বসবাস ছিল বাংলাদেশের যশোর, নড়াইল, ঝিনেদা, মাগুরা, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার বিভিন্ন এলাকায়। দেশ স্বাধীনের আগে থেকে তারা বনগাঁ, গায়ঘাটা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে আসছেন। ভিসা জটিলতার কারণে অনেকে সবসময় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতে না পারলেও বাংলাদেশের খবর জানতে তাদের মধ্যে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। প্রিয়ভূমি, স্বজনদের প্রতি টান থেকেই তারা প্রতিদিন ছুটে আসেন বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে। বাংলাদেশে ফেলে আসা স্বজনদের কথা মনে করে কেউ কেউ অশ্রুজলে মুখ ভাষায়। আবার অনেকেই হাত নেড়ে ইশারায় কথা বলে ফেলে আসা স্বজনদের সঙ্গে।

বেনাপোল চেকপোস্ট বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার শ্রী হারাধন বলেন, বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে উভয় দেশের সৈনিকরা একযোগে সকাল ও বিকেলে কুচকাওয়াজ ও পতাকা উত্তোলন করে। এটা দেখার জন্য উভয় দেশের শতশত দর্শনার্থী প্রতিদিন বিকেলে নোম্যান্সল্যান্ডে উপস্থিত হয়। সীমান্তে ‘রিট্রেট সেরেমনি’ বা ফ্ল্যাগ ডাউন’ অনুষ্ঠানটি দর্শনার্থীরা যাতে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারেন সে জন্য নোম্যান্সল্যান্ডে একটি অত্যাধুনিক গ্যালারি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য আসন রয়েছে ৩০০ আর ভিআইপি গ্যালারির আসন সংখ্যা রয়েছে ২০টি। ভারতীয় বিএসএফও একটি গ্যালারি নির্মাণ করেছে। যেখানে বসে থেকে এ অনুষ্ঠান সবাই উপভোগ করে থাকে।

মানবকণ্ঠ/এএএম