সৌন্দর্যের মোহনায় নিঝুম দ্বীপ

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত এই দ্বীপ অবারিত সবুজ, বৈচিত্র্যময় অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্যের দ্বীপ। একদিকে ম্যানগ্রোভ বন ও অন্যদিকে বিস্তীর্ণ বালুরাশির এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বৈচিত্র্যময় এবং সেই সঙ্গে কষ্টেরও বটে। অন্যদিকে পর্যটনের জন্য বড় একটি সম্ভাবনাময় জায়গা এই দ্বীপ।
এই দ্বীপের সৃষ্টি মূলত বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা চরের সমন্বয়ে। সময়ের সঙ্গে বাড়তে বাড়তে আজ বিশাল এক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা এসব চর বাংলাদেশের মানচিত্রে বেশ ভালোই প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।
চল্লিশের দশকের শেষের দিকে কিংবা পঞ্চাশের দশকের প্রথমে মানুষ প্রথম এর সন্ধান পায়। হাতিয়া, চরফ্যাশন, রামগতি, শাহবাজপুর ইত্যাদি অঞ্চলের জেলেরা মাছের সন্ধানে যেত দূর-দূরাঞ্চলে। এরাই প্রথম এই দ্বীপের সন্ধান পায়। দ্বীপের সন্ধান পাওয়ার বহুদিন পরেও দ্বীপে বসতি গড়ে ওঠেনি। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে খুব সম্ভবত ১৯৫৭ সালে প্রথম হাতিয়াসহ আশপাশের কিছু অঞ্চলের বাথানিয়ারা (মহিষ পালক) সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। এই দ্বীপ স্থানীয়দের মধ্যে ইছামতী নামেও পরিচিত ছিল। নোয়াখালী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় চিংড়িমাছের নাম ‘ইছা’, ‘ইচা’ বা ‘ইছামাছ’। নিঝুম দ্বীপের আশপাশে প্রচুর চিংড়ি পাওয়া যেত তখন। এ থেকেই এই নামে ডাকা হয়। চরজুড়ে উঁচু বালুর ঢিবি ও বিস্তীর্ণ বালুরাশির কারণে স্থানীয়রা এই দ্বীপকে ‘বাউলার চর’ও বলে থাকে। বাথানিয়াদের সর্দার ছিল বাতাইন্না ওসমান (বাথানিয়ার স্থানীয় নাম)। তার নামেই বেশ অনেকদিন এই দ্বীপ ‘চর ওসমান’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫৯-৬০ সালে বাংলাদেশের ভূমি বিভাগের চালানো জরিপে ওসমান বাতাইন্নার আন্তরিক সহায়তার কারণে তৎকালীন ভূমি অফিসার তার নামে দ্বীপের নাম দেন ‘চর ওসমান’। তখন থেকেই এই নামে দ্বীপটি পরিচিত ছিল। দ্বীপের উত্তরাংশের নাম চরকমলা, উত্তর-পূর্বাংশের নাম বন্দরটিলা। ’৭০-এর দশক থেকে এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে এই দ্বীপের নাম পরিবর্তন করে প্রশাসনিকভাবে নিঝুম দ্বীপ রাখা হয়।
জীববৈচিত্র্য
১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের বনবিভাগ এখানে উপকূলীয় বনাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। ২০ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রায় ২ কোটি ৪৩ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়। এই অঞ্চলের বনভূমির গাছপালার মধ্যে আছে কেওড়া, গেওয়া, কাঁকড়া, বাইন ইত্যাদি। এছাড়াও প্রায় ২১ প্রজাতির বৃক্ষ ও ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম আছে এই দ্বীপে।
চিত্রাহরিণ, বন্য কুকুর, সাপ, বনবিড়াল ইত্যাদি প্রাণী ও সারস, মাছরাঙা, সোয়ালো, বুলবুলি, হট্টিটি, চিল, আবাবিলসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির পাখির সমন্বয়ে এই দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিবেচনায় অমূল্য সম্পদ। ১৯৭৮ সালে বনবিভাগ চার জোড়া চিত্রা হরিণ এনে দ্বীপে জঙ্গলে ছাড়ে। পরবর্তী কয়েক দশকে এর পরিমাণ বেড়ে বিশ হাজারের বেশি বলে জানা যায়। শীতকালে অতিথি পাখির বিচরণে এই দ্বীপ অনন্য এক রূপ ধারণ করে। সমগ্র বাংলাদেশে অতিথি পাখির যেই অপূর্ব বিচরণ দেখা যায়, তার সবচেয়ে মধ্যকার সবচেয়ে অভিন্ন, অনিন্দ্য এবং বৈচিত্র্যময় দৃশ্যের দেখা মেলে এই দ্বীপে।
পর্যটন
বাংলাদেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকার তুলনায় নিঝুম দ্বীপ অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। নোয়াখালী জেলার মূল অংশেই জীবনযাত্রার মান উন্নত নয়। সেদিক দিয়ে নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালীর মূল অংশ অনেকটা দূরে ভৌগোলিক অবস্থানের ক্ষেত্রে। হাতিয়াই নোয়াখালীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত নয়, সেখানে নিঝুম দ্বীপ তো হাতিয়া থেকেও আরো দূরে অবস্থিত। এহেন অবস্থা, অর্থাৎ দূরত্ব ও যাতায়াত সমস্যার কারণে এর পর্যটন এখনো অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। বেশ কষ্ট সহ্য করার এবং সময় ব্যয় করার মানসিকতা নিয়েই যেতে হবে নিঝুম দ্বীপে। সময় কম নিয়ে তাড়াহুড়া করলে এই প্রকৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধি সম্ভব নয়।
যাতায়াত
স্থল ও জলপথ, উভয় পথেই আসা-যাওয়া করা যায় এই দ্বীপে। সড়ক পথে সময় কিছুটা কম লাগে। সেক্ষেত্রে আপনি লঞ্চ ভ্রমণের অপূর্ব অভিজ্ঞতা পাবেন না। ভ্রমণ ডেস্ক