সোশ্যাল মিডিয়ায় এড়াতে হবে যা

নিজের চাকরি নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয় সামির। কেননা, তার বস তার কোনো কাজেই খুশি হয় না, উল্টো সব সময় তার কাজের খুঁত ধরতে থাকে। কতদিন এভাবে মুখ বুজে সহ্য করা যায়? তাই তো একদিন রেগেমেগে ফেসবুকে নিজের বসকে নিয়ে ইয়া… বড় একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দিল সামির! মিনিটখানেকের মধ্যে লাইক-কমেন্ট-রি-অ্যাক্টে ভরে গেল তার স্ট্যাটাস। এর ঘণ্টাখানেক পরেই নিজের মেইল চেক করতে গিয়ে সামির যা দেখল, তা দেখে তার চক্ষু চড়কগাছে! তার সেই বিশাল বড় স্ট্যাটাসের বিপরীতে বস তাকে পাঁচ লাইনের ছোট্ট একটা মেইল পাঠিয়েছেন। আর তার মূলকথা হচ্ছে, ‘তোমার যেহেতু চাকরি নিয়ে এত সমস্যা, তুমি তাহলে কাল থেকে আর অফিসে এসো না।’ কিছু বুঝলে তাহলে? একটা ছোট্ট স্ট্যাটাসই সামিরের এত বড় একটা সমস্যা তৈরি করে ফেলেছে। ফেসবুক এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা কারো জন্য ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে। ফেসবুককে সাধারণত সড়কের চৌরাস্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়। একটা রাস্তার চৌরাস্তায় যা হচ্ছে, সেটা যে কোনো সাইডের রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবে যে কেউ। ফেসবুকসহ বাকি সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলো ঠিক তেমনিই। যেই জিনিসটা এসব সাইটে শেয়ার করা হবে, খুব দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।

ছুটি কাটাতে কোথায় যাচ্ছ: আমরা কখন, কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে যাচ্ছি সেগুলোর সব তথ্য আমরা আমাদের ভার্চুয়াল বন্ধুদের জানাতে চাই। কিন্তু এসব তথ্য কি শুধু ভার্চুয়াল বন্ধুরাই দেখে? হয়তো এমন কেউও দেখে ফেলতে পারে যে তোমার অগোচরে তোমার দিকে নজর রাখছে তোমার বাসায় হামলা করার জন্য! অনেক সময় দেখা যায় কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে আমরা আমাদের লাগেজ কিংবা কোনো বাহনে ওঠার ছবি দিই। এই ছবিগুলো দেখে অনেক সময় হামলাকারীরা বাসায় আসার সুযোগ পেয়ে যায়! আর কাউকে যদি বেড়াতে যাওয়ার কথা জানাতেই হয়, তা যেন ফোনে ফোনে বলা হয় এবং খুব কাছের মানুষদেরই সেটা সম্পর্কে জানানো হয়।

পার্সোনাল লোকেশন: এই ভুল আমরা কম-বেশি সবাই করি। বাসায় তোলা কোনো ছবির পযবপশ রহ দিতে গিয়ে বাসার পুরো ঠিকানাটাই তুলে দেই। আর তোমার এই লোকেশন ট্র্যাক করে কিন্তু অনেকেই তোমার ক্ষতি করতে পারে।
জিওট্যাগড ইমেজ: জিওট্যাগড ইমেজ দ্বারা আমি এখন কোথায় আছি, সেটা সহজেই বোঝা যায়। এর ফলে যে কেউ তোমার লোকেশন সহজেই খুঁজে পাবে। এর সুবিধা নিয়ে কেউ তোমার ক্ষতি করারও চেষ্টা করতে পারে।

বিনা অনুমতিতে কারো ছবি পোস্ট করা: এখন বন্ধুদের জন্মদিন এলেই খুঁজে খুঁজে তাদের সবচেয়ে হাস্যকর ছবিটি আপলোড দেই। এগুলোকে আবার ‘ক্যান্ডিড’ও বলা হয়। কিন্তু এই ক্যান্ডিড ছবিগুলোই কিন্তু অনেক সময় বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারে। আমাদের হয়তো মনে হবে বন্ধুর এমন ছবি পোস্ট করলে কিছু হবে না, কিন্তু কিছু তো হতেও পারে। হয়তো আমরা তার এমন কোনো ছবি দিয়ে দিয়েছি, যা দেখার ফলে তার সম্মানহানি হবে। তাই কারো ছবি আপলোড দিয়ে দেয়ার আগে অবশ্যই সেই ব্যক্তির কাছ থেকে তার অনুমতি নিতে হবে।

নিজের ক্রেডিট কার্ডের ছবি: এমন বেশকিছু স্পর্শকাতর জিনিস রয়েছে, যেগুলো সবার সামনে এলে আমাদের বেশ বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। যেমন- ক্রেডিট কার্ড। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে আমরা অর্থ লেনদেন করি। এখন কেউ যদি আমাদের ক্রেডিট কার্ডের পিন কোড জেনে যায়, তাহলে যে কোনো মুহূর্তে আমাদের অর্থসহ সব তথ্য সে হাতিয়ে নিতে পারে। তাই কোনো ভাবেই নিজের ক্রেডিট কার্ডের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাইটগুলোয় আপলোড করব না।

মনোমালিন্যের বিষয়গুলো তুলে ধরা: মাঝে মাঝে আমরা, ‘আজকে আমার ফ্রেন্ডদের চেনা হয়ে গেল।’ কিংবা ‘এতদিন দুধ কলা দিয়ে বন্ধু নামের কালসাপ পুষেছি।’ -এই ধরনের স্ট্যাটাস দিয়ে থাকি। কিন্তু এই ধরনের স্ট্যাটাস মোটেও দেয়া উচিত নয়। কেননা এতে বন্ধুত্বের ক্ষতি হয়, যাকে ডেডিকেট করেছো সে কষ্ট পায় এবং তাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য তৈরি হয়। তাই নিজেকে সংযত করো, নিজের ব্যক্তিগত ঝামেলা সোশ্যাল সাইটে তুলে ধরো না।

অনুপযুক্ত ছবি পোস্ট করা: ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম হলো এমন ধরনের সোশ্যাল সাইট, যেখানে একবার একটা কিছু পোস্ট করলে তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই আমরা অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কোনো ছবি পোস্ট করব না, যেগুলো দেখলে কেউ বিব্রতবোধ করতে পারে। কিন্তু তুমি কীভাবে বুঝবে যে, কোন ছবি পোস্ট করবে আর কোন ছবি পোস্ট করবে না? তুমি নিজেই একটা ব্যাপার চিন্তা করে দেখো, যে ছবি তুমি তোমার বন্ধুদের দেখাতে পারবে, সেই ছবি কি দাদির বয়সী গুরুজনকে দেখাতে পারবে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে সেটা পোস্ট করার মতো ছবি আর যদি না হয়, তাহলে সেই ছবি শেয়ার না করাটাই ভালো।

নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য: ক্রেডিট কার্ডের মতো এটাও খুব সেনসিটিভ বিষয়। নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কোনো তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে, টাকা পয়সা যে কোনো সময় বেহাত হয়ে যেতে পারে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বাজে মন্তব্য: রাগের বশে আমরা কতজনকে কত কিছুই না বলে ফেলি। কিন্তু এই বলে ফেলার ক্ষেত্রে মুখে লাগাম দিতে হবে। একদম শুরুতে যা বললাম, বস যদি একবার সেই স্ট্যাটাস দেখে, কিন্তু অবস্থা পুরো খারাপ হয়ে যাবে!

রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা: রাজনৈতিক কোনো কিছু নিয়ে মন্তব্য করার আগে দেখতে হবে এই কথাটা আসলেই সত্য কিনা। কারণ রাজনীতি নিয়ে ভুল অথবা অনিশ্চিত কোনো কথা বলতে গেলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়।

যা সবার জন্য উপযুক্ত নয়: আমরা আসলে নিজেদের যা বয়স, তার থেকেও বড় সাজার ভান করি ‘কুল ডুড’ হওয়ার জন্য। কিন্তু তোমার এই ‘কুল ডুড’ হওয়ার চেষ্টা দেখে আড়ালে কত মানুষ যে হাসে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই! বর্তমানে যেটা নিয়ে ট্রেন্ড চলছে, তাহলো ‘মিম এবং ট্রল’। মিম ও ট্রল মূলত মানুষকে হাসানোর জন্য বানানো হয়? কিন্তু মাঝে মধ্যে এসব জিনিসে এত বেশি এডাল্ট কন্টেন্ট থাকে, যা আমাদের বন্ধুতালিকায় থাকা অনেকেরই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পার্টির ছবি দেয়া: বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করতে আমরা সবাই ভালোবাসি। আর হৈ-হুল্লোড়ের ফাঁকে ফাঁকে চলে সেলফি তোলা। কিন্তু এসব ছবি পোস্ট করার আগে দেখে নাও যে ছবিগুলো আপলোড দেয়া উচিত কিনা? পার্টি করার সময় আমরা এমন অবস্থায় থাকতে পারি, যেই অবস্থায় তোলা ছবি কেউ দেখলে আমাদের ব্যক্তিত্বে আঁচ পড়তে পারে।

গেমের আপডেট: একটা সময় ছিল, যখন ফেসবুক খুললেই সামনে আসত কার, কয়টা গরু-ছাগল হয়েছে, কে কত নাম্বার ক্ল্যানে, কে, কোন, কেস সলভ করল। বলছিলাম অনলাইম গেম ‘ফার্মভিল’, ‘ক্ল্যাশ অব ক্ল্যানস’ এবং ‘ক্রিমিনাল কেস’-এর কথা। এসব জিনিস সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার না করাই ভালো। এগুলো দেখলে অনেকে বেশ বিরক্তবোধ করে। কারণ কেউ নিশ্চয়ই তার নিউজফিডে একটু পরপর এসব জিনিসের আপডেট চাইবে না! আর তাছাড়া এগুলো সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে দেয়া উচিত না।
তথ্য ও সূত্র: টেনমিনিট স্কুল – ফেসটিউব ডেস্ক