সোনালি আঁশ পাটের সুদিনের প্রত্যাশা

সোনালি আঁশ পাটের সুদিনের প্রত্যাশা

পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ হিসেবে এক সময় ব্যাপক পরিচিতি ছিল। পাট চাষ, পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক সময় আমাদের অর্থনীতি আবর্তিত ছিল। দেশের অধিকাংশ এলাকায় ধান ও পাট চাষ ছিল অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু এসব ইতিহাস শুধুই স্মৃতি হিসেবে ছিল আজ থেকে ১০ বছর আগেও। বিগত ১৩/১৪ বছর আগে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রাচীন জুট মিল ‘আদমজী জুট মিল বন্ধ করার মধ্য দিয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট চাষ, পাট শিল্প, পাটকে ধ্বংস করার পথ প্রশস্ত হয়। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আরো কিছু পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশ্য এর আগে পাট চাষকে নিরুৎসাহিত করতে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর প্রেসক্রিপশনে সোনালি আঁশ পাটের সর্বনাশ সাধন করা হয়। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও একান্ত আন্তরিকতায় ধীরে ধীরে সোনালি আঁশ পাটের সুদিন ফিরে আসতে শুরু করে। লোকসানি পাটকলসমূহ ধীরে ধীরে লোকসান কমিয়ে আনাসহ স্বল্প পরিসরে হলেও লাভ করতে শুরু করে।

একই সঙ্গে পাটের বহুমুখী ব্যবহার, উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রণোদনা, বীজ, সারসহ কীটনাশক প্রদান, বন্ধ পাটকলসমূহকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোপূর্বে পাট থেকে পাট পাতার পানীয়, চারকোল, ‘ভিসকোস’ নামের নানা রকম ও বাহারি ব্যাগ, জুতাসহ পাট পণ্যের তৈজস উৎপাদন করা হচ্ছে।

অনুরূপ আগামী ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাট থেকে সোনালি ব্যাগ উৎপাদন হবে । সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহার উৎসাহিত করে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করার মাধ্যমে পাট চাষিদের সোনালি স্বপ্ন পূরণে জোরদার পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান সরকার। বর্তমান সরকার কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ, পাটজাত পণ্য রফতানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পাটকে বিশ্ব বাজারে তুলে ধরতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার চালু করেছে। এখান থেকে ২৩৫ প্রকার পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটপণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারকোল, ভিসকোস, পাটপাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে ।

পাট থেকে সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্য এর একটি খ্যাতনামা কোম্পানির সঙ্গে বিজেএমসির একটি সমোঝতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি এনডিএ স্বাক্ষরিত অনুষ্ঠিত হয় সম্প্রতি। এর আগে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী পাটের জিনম (জন্ম রহস্য) আবিষ্কার ও উন্মোচন করায় পাটের সোনালি আঁশের হারানো ঐহিত্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই থেকে নিরন্তর পাট নিয়ে বিজ্ঞানীদের চলে গবেষণা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে। পাটের তৈরি ব্যাগ মাটিতে ফেললে তা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না। এই ব্যাগ দামে সাশ্রয়ী হবে। এভাবে পাটের ব্যবহার বাড়লে ন্যায্য দাম পাবেন কৃষক। অতীতের মতো বাংলাদেশ পাট দিয়েই বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত হবে।

পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ তৈরির প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় ১২ মে ২০১৭। বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ পাইলট প্রকল্প পর্যায়ে উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি। রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুটমিলে সোনালি ব্যাগ তৈরির প্রাথমিক পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এর সফলতা আসবে এবং ধীরে ধীরে এ শিল্প প্রসারিত হবে। বর্তমানে বিজেএমসির উদ্যোগে একটি ম্যানুয়েল পাইলট প্ল্যান্ট দিয়ে সোনালি ব্যাগ তৈরির কাজ করছে। তবে বৃহৎ পরিসরে নতুন উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ তৈরিতে দেশে বা বিদেশে কোনো মেশিন তৈরি হয়নি। তাই এ ধরনের মেশিন তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে মেশিন তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার পলিব্যাগ উৎপাদন করা সম্ভব। প্রকল্পটি সফলভাবে পরিচালিত হওয়ায় দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে এই পলিব্যাগের উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ তৈরির উদ্দেশ্যে পাট থেকে সেলুলোজ আহরণ করা হয়। ওই সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে অন্যান্য পরিবেশবান্ধব দ্রব্যাদির মাধ্যমে কম্পোজিট করে ব্যাগ তৈরি করা হয়। উৎপাদিত ব্যাগে ৫০ শতাংশের বেশিরভাগ সেলুলোজ বিদ্যমান। তা ছাড়া এতে অন্য কোনো প্রকার অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার হয় না বিধায় এটি দুই থেকে ৩ মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আবিষ্কৃত এই ব্যাগের ভার বহন ক্ষমতা পলিথিনের প্রায় দেড় গুণ এবং পলিথিনের মতোই স্বচ্ছ হওয়ায় খাদ্য দ্রব্যাদি ও গার্মেন্টস শিল্পের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী। তা ছাড়া দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করায় এই ব্যাগের দাম প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের কাছাকাছিই থাকবে। পাট থেকে আবিষ্কৃত পচনশীল পলিব্যাগ এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। তা ছাড়া এই ধরনের প্যাকেজিংয়ের চাহিদা রয়েছে বিদেশেও । শিগগিরই পাট থেকে তৈরি সোনালি ব্যাগ বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এই উদ্যোগের ফলে একদিকে পাটের সোনালি দিন ফিরে আসবে। অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
– লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.