‘সেভেন সিস্টারের গেটওয়ে’ হতে বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অধিপতি মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব। সিপিএম-এর ২৫ বছরের ক্ষমতার ভিত নড়িয়ে গত বছর তিনি বিজেপি থেকে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে বাংলাদেশের সহযোগিতা চান। বাংলাদেশের চাঁদপুরের কচুয়ায় বিপ্লব কুমারের পৈত্রিক বাসস্থান। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকের মতো তার পরিবারও পাড়ি জমায় ত্রিপুরায়। আর ফিরে আসেননি বিপ্লবের বাবা হিরুধন দেব ও মা মিনা রানী দেব। ত্রিপুরাতেই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং সেখানেই জন্ম বিপ্লবের। একমাত্র ছেলে বিপ্লব দেবের অনেক আত্মীয়স্বজন এখনো বসবাস করছেন চাঁদপুরের কচুয়ায়।

দৈনিক মানবকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব। তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সর্বশেষ খোঁজখবরও রাখছেন নিয়মিত। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদী তিনি। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ কোনো ভুল করবে না, বরং একটি উন্নয়নমুখী দলকেই ক্ষমতায় আনবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস তার।

তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের মানুষকে বিশ্বাস করি। তারা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবে বলে মনে করছি। মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, এর আগে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে নির্বাচন করতে হতো, যা বিশ্বে নেতিবাচ বার্তা যেত। এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তাই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে নির্বাচন করার প্রয়োজন পড়ে না। এজন্য বর্তমান সরকারের প্রশাসনকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী ক্ষমতাসীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসার আগ্রহ জানিয়েছেন ত্রিপুরার এই তরুণ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব।

ঢাকা-ত্রিপুরা সম্পর্ক নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব মানবকণ্ঠকে জানান, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও এই দুটি দেশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে তার। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই সম্পর্ক যত বাড়বে ত্রিপুরার উন্নয়নও তত বেশি হবে।

তিনি বলেন, আমি ত্রিপুরাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়তে চাই। ত্রিপুরাকে ‘সেভেন সিস্টারের গেটওয়ে’ করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাই। এ ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ত্রিপুরাসহ সেভেন সিস্টারের উন্নয়ন নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। এই উন্নয়নে ট্রান্সপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের মূল ভুখণ্ড থেকে পণ্য পরিবহন করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো আনা অত্যধিক খরচের ব্যাপার। এজন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি হয়েছে তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দরকার বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে উভয় দেশই লাভবান হবে। কারণ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্য মূল ভ‚খণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। এই রাজ্যগুলোতে তেমন উন্নয়নও হয়নি। কলকারখানাও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় সব পণ্য ১২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই ৭টি রাজ্যের চাহিদা মেটাতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি পড়ে।

তিনি জানান, ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে স্বপ্নের একটি বাড়ি বানাতে যা খরচ হয়, এই রাজ্যগুলোতে তার দ্বিগুণ খরচ হয়। অথচ বাংলাদেশের নদীপথে বা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আমরা সহজে ও কম খরচে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারি। এতে ত্রিপুরা পণ্য পরিবহনে ৭টি রাজ্যের গেটওয়ে হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশও ‘ট্রানজিট এবং ট্রান্সশিপমেন্ট ফি’ পেতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব আরো জানান, কলকাতার হলদিয়া বন্দর থেকে সরাসরি ত্রিপুরায় পণ্য আনতে চাই। এজন্য বাংলাদেশের আশুগঞ্জ থেকে ত্রিপুরার সোনামুড়ি পর্যন্ত গোমতি নদী খনন করতে হবে। এতে বাংলাদেশে সরকার ২০ ভাগ এবং ভারত সরকার ৮০ ভাগ খরচ দেবে। ফলে জলপথে পণ্য পরিবহন আরো সহজ ও কম খরচে ত্রিপুরায় পৌঁছাবে। এতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যের ‘লজিস্টিক হাব’ হিসেবে গড়ে উঠবে ত্রিপুরা। বাংলাদেশও এসব রাজ্যগুলোর পণ্য পরিবহন বাবদ অর্থ পাবে। এ ছাড়া ত্রিপুরা থেকেও চা নিতে পারবে বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশে ২০ হাজার টন চা বাইরে থেকে যায়। ত্রিপুরাও চা রফতানি করতে চায়।

বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের ত্রিপুরায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেন, আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য অনলাইনে ওয়ানস্টপ সার্ভিস করে রেখেছি। সব সময় এখানে আসার প্রয়োজন নেই। এখানে ফ্যাক্টরি করার জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারেন। আমাদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ রয়েছে। বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে সিমেন্ট ও রড ফ্যাক্টরি করতে পারেন। আমরা তাদের সবধরনের সুযোগ সুবিধা দেব।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় ‘আইটি হাব’ হবে আমাদের। বাংলাদেশের কলসেন্টারে কাজ করতে পারে আমাদের আইটি বিশেষজ্ঞরা। ভারতের বিভিন্ন নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি সেক্টরে ত্রিপুরার ছাত্ররা রয়েছেন। কাজেই এখানে লোকবলের অভাব হবে না। তিনি বলেন, ত্রিপুরায় অনেক সম্পদ ও সম্ভাবনা রয়েছে। ত্রিপুরাকে আগামী ৩ বছরের মধ্যে উন্নয়নের মডেল রাজ্য গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব ।
সন্ত্রাসবাদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রশংসা করে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেন, এজন্যই আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো শান্তিতে আছে। শেখ হাসিনার এই নীতির কারণে এসব রাজ্যে আর জঙ্গি ঢুকতে পারে না। এসব রাজ্যে যে অস্থিরতা ছিল এখন তার পরিবর্তন হয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেন, গত ১০ বছরে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অকে শক্তিশালী। তিনি জানান, ত্রিপুরার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করা এবং ট্রান্সশিপমেন্ট ও ট্রানজিটের জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়ায় এ রাজ্যের মানুষ বাংলাদেশ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।

ত্রিপুরার পালাটানায় ৭২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পেছনে শেখ হাসিনার অনেক অবদান রয়েছে। তার অনুমতিতেই বাংলাদেশের সড়ক ও জলপথ ব্যবহার করে ভারি যন্ত্রপাতি এ রাজ্যে আনা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজের মায়ের মতো উল্লেখ করে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের বিজেপি সভাপতি হিসেবে যখন প্রথমবার ঢাকা সফরে গিয়েছিলাম, তখন শেখ হাসিনাকে মায়ের মতো দেখেছিলাম এবং ত্রিপুরার প্রতি তার যে ভালোবাসা সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজের ছেলের মতো করেই আমাকে আপ্যায়ন করেছিলেন। বিপ্লব দেবের অভিমত, শেখ হাসিনার প্রতি তার ব্যক্তিগত আনুগত্য রয়েছে।

এ ছাড়া ত্রিপুরার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্প্রীতি কমিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব। তিনি বলেন, এই সংগঠনটি বাণিজ্যিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সেক্টরে দু’দেশের জনগণের মধ্যে আরো মেলবন্ধন গড়তে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের কাজের ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ারও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ