সেপ্টেম্বরে মাঠে নামবে বিএনপি-যুক্তফ্রন্ট

আসন্ন একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিন্ন ইস্যুতে মধ্য সেপ্টেম্বরে মাঠে নামবে যুক্তফ্রন্ট। এ লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করতে কাজ করছে উভয় পক্ষ। আর শিগগিরই আন্দোলন, নির্বাচন এবং আসন্ন সমঝোতা বিষয়েও আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবেন উভয় দলের নেতারা। যুক্তফ্রন্ট এবং বিএনপির একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছেন। ভোটের রাজনীতি এবং নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও ভোটের বছরে ক্রমাগত আলোচনায় রয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

প্রায় দেড় দশক ধরে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর মঙ্গলবার (২৮ আগস্ট) এই ফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। তবে বৃহত্তর ঐক্য গঠনে এদের সঙ্গে এখনো বিএনপির আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি। যুক্তফ্রন্ট নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পৃথক আলোচনা হলেও জোটগতভাবে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন জানিয়েছেন অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শিগগিরই বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হবে। আর গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, জাতির ক্রান্তিলগ্নে ড. কামাল হোসেন ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী একসঙ্গে কাজ করতে একমত হয়েছেন।

সুষ্ঠু নির্বাচন দাবিতে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে মাঠে নামবে নতুন এই জোট। অন্যদিকে যুক্তফ্রন্টের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিন্ন ইস্যুতে যুক্তফ্রন্ট এবং বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেবে। তবে খোদ যুক্তফ্রন্টেই এখনো জট কাটেনি। ড. কামাল হোসেন এবং বি. চৌধুরী একসঙ্গে কাজ করতে একমত হলেও এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চেয়ারম্যান বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী। গতকাল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মহাসচিব হাবিবুর রহমান তালুকদার মানবকণ্ঠকে বলেন, যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এ ব্যাপারে আমরা আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব।

এদিকে গণফোরামকে নিয়ে যুক্তফ্রন্টের জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। আজকে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এই জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।

২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের মধ্য দিয়ে বিকল্পধারা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য এই ৩ দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান করা হয় বি. চৌধুরীকে। ওই বৈঠকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ উপস্থিত থাকলেও পরে কাদের সিদ্দিকীকে আর যুক্তফ্রন্টের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে দেখা যায়নি। এক বছরের বেশি সময় বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্টে যোগদান থেকে বিরত থাকে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম। প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দিলেও একাই চলেছেন কামাল হোসেন।

আইন পেশায় ব্যস্ততার পাশাপাশি বছরের প্রায় অর্ধেক সময় বিদেশে থাকেন ড. কামাল হোসেন। রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি পালনের কথা বলেও বিদেশে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বহুবার।

জোট গঠনের আগে সম্ভাব্য দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে এর আগে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে মেনে নিতে পারেননি ড. কামাল হোসেন ও বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। সব মিলিয়ে যুক্তফ্রন্টের দলগুলোর মধ্যে ড. কামাল হোসেনের ব্যাপারে প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে কিছু দিন আগে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন ড. কামাল হোসেন।

বি. চৌধুরী বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে পারব না। তিনি তো এসেছেন, সাদা কাগজে সই দিতেও প্রস্তুত জানিয়েছেন। এমনকি ‘আমি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী’ মর্মে একটি কাগজে সইও করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি একাই করেছেন। বাক্যটির খসড়া তৈরি করেছিলেন আমাদের দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। আমার কোনো শর্ত নেই। যারা আন্তরিকভাবে গণতন্ত্র চান তারাই যুক্তফ্রন্টে আসতে পারেন।’

২০ জুলাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চেয়ারম্যান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা বি. চৌধুরী আর ড. কামাল হোসেনের কার্যকর নেতৃত্ব দেখতে চাই। এটা ফ্রন্ট হোক বা জোট হোক, তার প্রধান হবেন বি. চৌধুরী। নির্বাচনের পর সরকার গঠন করলে সরকার প্রধান হবেন ড. কামাল হোসেন। শুধু ঘোষণা দিয়ে থেমে থাকেননি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ড. কামাল হোসেনকে সরকারপ্রধান করার জন্য বেশ তৎপরতাও চালান তিনি। সম্প্রতি বি. চৌধুরী, তার ছেলে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী ছাড়াও আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে কামাল হোসেনকে প্রধানমন্ত্রী করা যায় এমন মনোভাব ব্যক্ত করেন কাদের সিদ্দিকী।

জবাবে নেতারা প্রশ্ন তোলেন, ড. কামাল হোসেন কি যুক্তফ্রন্টে আসবেন বা তিনি কি যুক্তফ্রন্টের কেউ? ড. কামাল যুক্তফ্রন্টে এলে তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে বলে মত দেন তারা। তবে সরকারপ্রধান করার বিষয়ে তারা কথা বলেননি। বিএনপির পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেনকে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দেয়া হয়েছে কিনা- এমন সংশয়ও সৃষ্টি হয় যুক্তফ্রন্টের দলগুলোর মধ্যে।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, কামাল হোসেনকে ভবিষ্যতে সরকারপ্রধান করার প্রস্তাব শুধু তার নিজ দলের। এ নিয়ে অন্য কারো সঙ্গে আলোচনা হয়নি। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করার প্রচেষ্টা নয়, আমরা একটি জাতীয় ঐক্য চাই। সেখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের জন্যই রাস্তা খোলা।

মানবকণ্ঠ/এএএম