সুবিস্তৃত ঝরনাধারায় জাদিপাই

রূপকথার মতো তার পানির ধারা। যে পানির ছোঁয়া না পেলে মনে হবে জীবনটাই যেন অর্থহীন, ঠিক সেইরূপ হিমশীতল ঝরনার পানিতে শরীর একবার ভেজানোর জন্যও মরুভূমি হয়ে থাকে বুকের উষ্ণ জমিনটুকু।
বাংলাদেশের বুকেই আছে এমনই এক গরবিনী ঝরনা যার পাশ দিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায় দিনের বাতাস, যে ঝরনায় প্রবেশের জন্য আকাশ সমান গাছের কাছে অনুমতি চেয়ে বেড়ায় ভোরের রোদ্দুর, যে ঝরনায় এখনো কাচের মতো স্বচ্ছ টলটলে পানি আয়না হয়ে অপেক্ষা করে নতুন কোনো বিস্ময়ে বিহ্বল চোখের জন্য, যে ঝরনা এখনো শহুরে মানুষের চোখে অদেখা এক জাদুকরি ঝরনা। নিজেকে আর সবার কাছ থেকে আড়াল করে বান্দরবানের গহিন অরণ্যে বয়ে চলা এ ঝরনাটির নাম ‘জাদিপাই ঝরনা’।
তিন্দু সম্পর্কে একটা বিশাল বই লিখলেও এর সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও তুলে ধরা সম্ভব নয়। আকাশ-কুয়াশা-মেঘ-নদী-পাথর-পাহাড়-ঝরনা-বন-নীল-সবুজ পানি, পাহাড়িদের জীবন আর রহস্য-রোমাঞ্চ-ভয় সব যদি একবারে পেতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন তিন্দু।
সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয়, তখন নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতে হয় এ দেশটাতে জš§ানোর জন্য।
বান্দরবান কন্যা তিন্দুকে ফেলে সাঙ্গু নদীর প্রকৃতিকে দু’চোখে গিলতে গিলতে আমাদের চলে আসতে হলো রুমা বাজার। কারণ, জাদিপাই ঝরনায় যেতে হলে এখান দিয়েই যেতে হবে। পার হতে হবে প্রকৃতির বিস্ময় বগা লেক এবং কেওক্রাডংকে। এ দুটির মাঝে পড়ে চিংড়ি ঝরনা আর সবচেয়ে গোছানো পাহাড়িপাড়া হিসেবে পরিচিত দার্জিলিংপাড়া।
এ অঞ্চলের সবচেয়ে খোলামেলা ও সুন্দর পাড়া হলো এই পাসিংপাড়া। এখানে এক জায়গায় দাঁড়িয়েই সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখা যায়। লালমাটির এই পাড়া থেকে অনেক নিচে ছবির মতো দেখা যায় জাদিপাইপাড়া।
পাড়ার ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখে মনে হবে সব ছেড়েছুড়ে শহুরে জীবন ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ি তাদের ভিড়ে। রোদ-বাতাস-বৃষ্টি-কুয়াশা সব শুধু তাদের জন্য, তাদের কোনো ব্যস্ততা নেই, অচেনা পথিকেরা হেঁটে গেলে খুব আগ্রহ নিয়ে অনেক ক্ষণ চেয়ে থাকে কৌতূহলী চোখ নিয়ে, এরপর আবার লুটিয়ে পড়ে লালমাটির ধুলায়। চলতি পথেই হঠাৎ কানে আসবে উত্তাল ধ্বনি। এক লহমাতেই বুঝে যাবেন এটাই তো ঝরনারই আওয়াজ, যাকে দেখতে এত দূরে ছুটে আসা, এটা সেই জাদিপাই ঝরনা।
এই ঝরনার শেষের ৩০ মিনিট নামাটা বিপজ্জনক, খাড়া পাহাড় বেয়ে গাছ ধরে ধরে নামতে হয়। কোথাও মাটি ঝুরঝুরে, কোথাও মাটি পিচ্ছিল, আবার কোথাও মাটিই নেই একদম গাছ ধরে ঝুলে পড়া! এমন করেই নামতে নামতে পানির ঝমঝম শব্দকে ছাপিয়ে সারাটা শরীর ছমছম করে ওঠে এই ঝরনার বিশালতা দেখে। প্রায় ২৫০ ফুট ওপর থেকে একাধারে পড়া পানির তিনটি ধাপে তৈরি করেছে সাতটি ছোট ছোট রংধনু, একটানা ঝমঝম শব্দ নিমেষেই ভুলিয়ে দিয়েছে যাত্রাপথের সব ক্লান্তি, মুছে দিয়েছে আবার তিন হাজার ফুট পাহাড় বেয়ে ওঠার চিন্তা। নিরাপদ ঝরনা এটা, কারণ পানি এখানে তিনটি ধাপে পড়ে, ফলে সরাসরি মাথায় কিছু এসে পড়ার ভয় নেই। পেছনে বানের রাজত্ব ফিরে পাওয়ার উল্লাসধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ফিরতি সময় দৃশ্যমান হবে বাতাসের দোলায় দুলতে থাকা গাছের ফাঁকা দিয়ে হাসছে জাদুপাই ঝরনার সাদা পানি। বিশাল সবুজ বন নিজের কোলের মধ্যে পরম মমতায় আড়াল করে রেখেছে প্রকৃতির এ জাদুকে।
কীভাবে যাবেন
জাদিপাই ঝরনায় যেতে হলে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবান। ঢাকা থেকে বান্দরবানে চারটি বাস যায়। ইউনিক, শ্যামলী, এস আলম ও ডলফিন। প্রতিটি সিটের জন্য ভাড়া পড়বে ৪৩০ টাকা। বান্দরবান নেমে যেতে হবে কাইক্ষ্যংঝিরি। স্থানীয় বাসে বা চান্দের গাড়িতে করে সেখানে হেলতে-দুলতে দুই ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। বাসভাড়া ৮০ টাকা, আর চান্দের গাড়ি রিজার্ভ গেলে পড়বে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। কাইক্ষ্যংঝিরি থেকে রুমাবাজার পর্যন্ত নৌকাভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা, আর রিজার্ভ গেলে এক হাজার টাকা। রুমা থেকে যেতে হবে বগা লেক পর্যন্ত। এখানে চান্দের গাড়ি ভাড়া দুই হাজার টাকার মতো। জাদিপাই যেতে হলে আপনাকে এই রুট ধরেই যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে গাইড ভাড়া বাবদ খরচ পড়বে দুই হাজার ৫০০ টাকা। সেখান থেকে শুধুই হাঁটাপথ। চিংড়ি ঝরনা, দার্জিলিংপাড়া, কেওক্রাডং, পাসিংপাড়া আর জাদিপাইপাড়া পার হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন জাদুকরী ঝরনা জাদিপাইতে। ভ্রমণ ডেস্ক