সুপ্রিম কোর্টের মূর্তি বিতর্ক

আনিস আলমগীর :

সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ভবনের সামনে একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। মূর্তিটি নারী মূর্তি, ন্যায়ের পাল্লা হাতে। আবার অপর হাতে একটা লাঠিও আছে। গ্রিক পুরাণ থেকে সংগৃহীত কোনো মূর্তি কিনা জানি না। অনেকে বলছেন গ্রিক মূর্তি। গ্রিক আর হিন্দু পুরাণেই বিদ্যার দেবী, শক্তির দেবী, ন্যায়ের দেবী, ধ্বংসের দেবী, ধনের দেবী- ইত্যাদি দেবী রয়েছেন। এটা কোন্ পুরাণের দেবী আমার জানা নেই। স্থাপনকারীরা কী উদ্দেশ্যে এ মূর্তিটা স্থাপন করেছেন তাও জানি না। কারণ বাংলাদেশের কোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে আমি এর সম্পর্ক দেখি না। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আমাদের অনেক স্থাপনায় এ রকম স্থাপত্য আছে, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। এগুলোকে লালন করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এ সবকে আমরা মূর্তি বিবেচনাও করি না।
সব ধর্ম-সম্প্রদায় সম্মান ও সমাদরের যোগ্য। তাই বিবাদ পরিহারের জন্য সব আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা করেনি। শুধু আমেরিকায় দেখা যায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণের সময় খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের ওপর হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেন। তাও এটা কোনো সাংবিধানিক বিষয় নয়। একটা রীতিপ্রথা মাত্র। অনাগতকালে অন্য ধর্মের কোনো লোক, বিশেষ করে কোনো মুসলমান যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন শপথের সময় যখন তাদের ধর্মগ্রন্থ কোরান স্পর্শ করার প্রশ্ন উত্থাপিত হবে তখন বিবাদও শুরু হবে। আমেরিকায় তখনই প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার সময় গ্রন্থ স্পর্শ করার রীতি প্রথাটাই উঠে যাবে সম্ভবত। এখন বিষয়টা এক তরফা বলে প্রথাটা নিয়ে কেউ কিছু বলছেন না।
মূর্তি প্রতীকী বিষয়। সনাতন ধর্মে এবং গ্রিক পুরাণে প্রত্যেক বিষয়ের একটা প্রতীক রয়েছে। দেবী সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তাই সনাতন ধর্মের অনুসারীরা বিদ্যার জন্য দেবী সরস্বতীর অর্চনা করে থাকে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন জগন্নাথ হলের সনাতন ধর্মের বিদ্যার্থীরা সরস্বতী দেবীর পূজার ব্যবস্থা করত। আমরা যেতাম পূজা দেখতে বা পূজার প্রসাদ খেতে। আনন্দ করতে। এখনো নানা পূজায় আমরা অংশ নেই, আনন্দের অংশ হিসেবে, ধর্মের অংশ হিসেবে নয়, পূজার উদ্দেশ্যে নয়।
আবার মূর্তি কিন্তু সনাতন ধর্মের বিশ্বাসের প্রতীক, তারা দেব-দেবীর মূর্তির পূজা করে। তাই মূর্তি ধর্মীয় বিষয়ও। একবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সরস্বতী দেবীর ছবি মনোগ্রামে স্থাপন করেছিল। এই নিয়ে কলকাতায় মুসলমান আর খ্রিস্টানেরা তুলকালাম কাণ্ড সৃষ্টি করেছিল। অবশেষে ছোটলাটের হস্তক্ষেপে তা মনোগ্রাম থেকে দেবীকে বাদ দেয়া হয়।
ভারত থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত এশিয়া মহাদেশের এ অংশে মানব জাতির ক্রমবিবর্তনের মাঝে মানব মনে যখন নিজেকে কারো কাছে সমর্পণে আকাক্সক্ষা জন্মেছিল তখন থেকেই অর্চনা প্রথার উন্মেষ ঘটে। তখন থেকে মূর্তিরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। যখন এক ঈশ্বরবাদী ধর্মের প্রবর্তক ইব্রাহিম, মূসা, ঈশা এবং মুহম্মদ (স.)-এর আবির্ভাব ঘটে তখন থেকে সাকারবাদীদের সঙ্গে নিরাকারবাদীদের সংঘাত উপস্থিত হয়। সাকারবাদ আর নিরাকারবাদ বিশ্বের প্রাচীনতম মতবাদ এবং এই দু’ সম্প্রদায়ের মাঝে বিরোধ প্রাচীনতম বিরোধ। এ বিরোধকে এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো।
ইউরোপ নবীন চিন্তার ধারক-বাহক। তারাও কিন্তু এ বিরোধ থেকে মুক্ত নন। সাম্প্রতিককালে ইউরোপেও প্রাচীন চিন্তার উন্মেষ ঘটেছে। কেউ যদি মূর্তিকে নবীন চিন্তার উপাদান মনে করেন তবে ইউরোপে তো মোড়ে মোড়ে মূর্তি, সেখানে প্রাচীন চিন্তা ফিরে আসছে কেন?
আসলে পৃথিবীর প্রলয় না হওয়া পর্যন্ত ধর্মীয় মতবাদ নিঃশেষ হবে না। এ জন্য আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মনীষীরা রাষ্ট্রকে ধর্ম-চিন্তার থেকে পৃথক রাখার পথ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে সংঘাত এড়ানো যায়। মূর্তি মানেই হচ্ছে সাকারবাদীদের ধর্মের অংশ  সাধারণভাবে নিরাকারবাদীদের কাছে এ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে হেফাজতের মতো উগ্র মৌলবাদীরা তাই মনে করে। বাস্তবে মূর্তি মানেই পূজার প্রতীক নয়। বাংলাদেশে হাজার হাজার মূর্তি আছে, আমরা যারা নিরাকারবাদী সে সব মূর্তিকে মৌলবাদীদের দৃষ্টিতে দেখি না। পূজার অংশ তো নয়ই।
যারা সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূর্তি স্থাপন করলেন তারা নিশ্চয়ই নিরাকারবাদী ধর্ম বিশ্বাসীদের ধর্ম বিশ্বাসটা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন না। এ দেশে ৯০ শতাংশ মানুষ নিরাকারবাদী ধর্ম বিশ্বাসে বিশ্বাসী। যদি এ মূর্তিটি সাধারণ স্থাপনা হতো তাহলে আমার আপত্তি নেই, এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটা ব্যাখ্যা দরকার। তবে কোনো দেবীর মূর্তি বা অকারণ স্থাপত্য হলে অথবা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির প্রশাসন এটি স্থাপন করে থাকলে মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করব এ মূর্তিটা সরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে। কারণ কোর্ট-কাছারি কোনো বিশেষ ধর্মের লোকদের নয়, সবার। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ‘রাষ্ট্র ধর্ম’ ইসলাম করে এমনিতেই আমরা রাষ্ট্রকে ধর্মীয় চরিত্র দেয়ার অপচেষ্টা করেছি, রাষ্ট্রের কিছু নাগরিককে হেয় করেছি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয়ের আর দরকার নেই। বরং সর্বোচ্চ আদালত পারলে রাষ্ট্র ধর্ম বাতিল করে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পারেন। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো ভোট হারানোর ভয়ে এটি বাতিলের কথা বলবে না। করবে না।
এই মূর্তিটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার ব্যবস্থার কোনো উপকার হবে না। সুতরাং মানুষের অনুভূতিকে আঘাত দিয়ে, অকারণে দেশে হট্টগোল কিংবা মৌলবাদীদেরকে ইস্যু হাতে দেয়া- জ্ঞানবাদীদের কাজ নয়। আমার মনে হয় যারাই এ মূর্তিটি স্থাপন করুন না কেন- একটা অপ্রয়োজনীয় কাজ করে তারা সমাজে বিবাদ সৃষ্টির দ্বার উদ্ঘাটন করলেন। এ মূর্তি স্থাপনের ফলে নিন্দুকদের দুটো উদ্দেশ্য সফল হয়েছে- (১) সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি একজন সনাতন ধর্মের লোক। উগ্রবাদী, ধর্মান্ধ কিছু লোক বিচার ব্যবস্থায় অন্য ধর্মের লোক নিয়োগে সন্তুষ্ট নন। এখন তারা বলাবলি করবে প্রধান বিচারপতি সনাতন ধর্মের লোক হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের সামনে দেবীর মূর্তি স্থাপন করেছেন। অথচ তল্লাশি করলে হয়তো জানা যাবে যে, তিনি বিষয়টা জানতেনও না।
আর দ্বিতীয় সুবিধা হলো আমাদের প্রধানমন্ত্রী ধর্মপরায়ণ লোক কিন্তু কখনো ধর্মান্ধ নন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেত্রী নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মসজিদে উলুধ্বনি হবে। তারা প্রচারে সফলও হয়েছিলেন। আগামী ২০১৯ সালে যদি নির্বাচন হয় তবে নির্বাচনী প্রচারণায় তারা এবার বলবে- ভোটে জিতে আওয়ামী লীগ এবার মসজিদের সামনে মূর্তি স্থাপন করবে। এই দেশের অনেক বেকুব সেটাই বিশ্বাস করবে।
আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ করব দেশে হট্টগোল বন্ধ করার কথা চিন্তা করে এবং আগামী নির্বাচনে অহেতুক অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করার জন্য অতি দ্রুত সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে মূর্তিটি যেন অপসারণ করা হয়। যারা বলছেন মূর্তি সরালে হেফাজতিদের জয় হবে, এটা কথার কথা। হেফাজতের কথায় রাষ্ট্র এটা সরাবে তা নয় বা হেফাজত বলছে বলে হেফাজত বিরোধীদের এটার বিরোধিতা করতে হবে- ইস্যুটা তেমনও নয়। এর প্রয়োজন-অপ্রয়োজনটা আগে দেখতে হবে। দেখতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস- ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সম্পর্র্ক কতটুকু। হেফাজতিদের গোত্ররাও এমন অনেক আবদার করতে পারে। তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত শিখা চিরন্তনকে অগ্নিপূজার অপব্যাখ্যা দিয়ে সরাতে চেয়েছিল। রাষ্ট্র এবং বিবেকবান মানুষ সেটা রুখে দিয়েছিল, কারণ এটা আমাদের চেতনার অংশ। এখনো আছে। এটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছিল। এই মূর্তি অথবা কথিত দেবী আমাদের কেউ নন। আমার মনে হয় এসব হার-জিতের কথা চিন্তা না করে মূর্তিটা সরানোই হবে রাষ্ট্রের জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত। যে মূর্তি দেশে মোল্লাদের আস্ফালন বাড়াবে, অপপ্রচারের সুযোগ দেবে, সর্বোপরি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে- তার প্রয়োজনইবা কি?

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

মানবকণ্ঠ/এসএস