সুন্দরবনে সাদা মাছের আড়ালে চলছে পার্শে পোনা নিধন

নিষিদ্ধ নেট জাল ও অত্যাধুনিক ট্রলার নিয়ে প্রতি বছরের মতো এ বছরও শুরু হয়েছে গভীর সুন্দরবনে পার্শে মাছের রেণু পোনা নিধন। এই লক্ষ্যে সপ্তাহখানেক আগেই সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে চোরা শিকারিরা। বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে অর্ধকোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তারা বনে প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাদা মাছ ধরার পাস নিয়েই চোরা শিকারিরা বনে প্রবেশ করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রানুযায়ী, ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে পার্শে মাছের রেণু পোনা নিধনের কার্যক্রম। এ জন্য পাইকগাছা উপজেলার চার ডিপো মালিকের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা দাদন নিয়ে খুলনার কয়রা উপজেলার ৩০টি এবং সাতক্ষীরা জেলা থেকে প্রায় ৫০টি দ্রুতগামী বিলাসবহুল ট্রলার নিয়ে চোরা শিকারিরা মাছ ধরতে গেছে। রাতের আধারে গভীর সুন্দরবনের অভায়রণ্য এলাকায় প্রবেশ করে পার্শে মাছের রেণু পোনা নিধনে মেতে উঠেছে তারা। একই সঙ্গে চোরা শিকারিরা সাদা মাছের আড়ালে রাতের আধারে পার্শে মাছের রেণু পোনার পাশাপাশি সুন্দরবন থেকে হরিণের মাংস, তক্কে সাপ, পশুর কাঠের মতো মূল্যবান সম্পদ এনে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার আলামতলা বাজার ও সাতক্ষীরা জেলা শ্যামনগর উপজেলার ঝাপালিয়া বাজার এলাকায় দিনে দুপুরে বিক্রি করছে।

সূত্রানুযায়ী, কয়রা উপজেলার ২ নম্বর কয়রা এলাকার বাবলু, মোজাম, সলেমান, সালাম, আমজেদ, শাহজাহান শেখ, মাসুম মোড়ল, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের আমিরুল ইসলাম, রেজাউল গাজি, মালেক পাড়, রবিউল ইসলাম, ৪ নম্বর কয়রা এলাকার ইসমাইল হোসেন, ৩ নম্বর কয়রা এলাকার আবদুর রহমান, আজিজুল গাজী, জামাল সরদার, রজব আলী, জাহিদুল সরদার, রজব গাজি, ৫ নম্বর কয়রা এলাকার জাহাঙ্গীর গাজি, আলাউদ্দিন এবং কাঠকাটা এলাকা থেকে তাজমিনুর সাদা মাছের পাস নিয়ে ট্রলার নিয়ে চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে প্রবেশ করেছে সুন্দরবনে। এরা মূলত সুন্দরবনের পার্শে পোনা আহরণের জন্য সাদা মাছের পাস নিয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে প্রবেশ করেছে সুন্দরবনে। এরপর তারা চলে আসছে সুন্দরবনের পশ্চিম রেঞ্জের অভায়রণ্যে। মাছ ধরতে যাওয়ার আগে জেলেরা পাইকগাছার আলমতলা এলাকার ডিপো মালিক লিটন, হাবিব, আনারুল সানা, রথ গাইনের কাছ থেকে কোটি টাকা দাদন নিয়ে গেছে।

সূত্র আরো জানায়, পার্শে পোনা ধরতে পূর্ব সুন্দরবনের দুবলা স্টেশন অফিসকে প্রতি গোনে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আলোরকোল টহল ফাঁড়ি ১০ থেকে ১২ হাজার, নারিকেলবাড়িয়া টহলফাঁড়ি ৮ থেকে ১০ হাজার, ছেলা স্টেশন অফিস ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, কোকিলমারি টহল ফাঁড়িকে ৫ হাজার টাকা এবং পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশন অফিস কর্মকর্তাদের ট্রিপ প্রতি ১০ হাজার, হড্ডা টহল ফাঁড়িকে ৫ হাজার টাকা, বানিয়াখালি স্টেশন অফিসের ১০ হাজার টাকা, সাতক্ষীরা রেঞ্জে কোবাদক স্টেশনকে ১০ হাজার, বুড়িগয়ালিনী অফিসকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে ট্রিপ প্রতি উৎকোচ দিয়ে গভীর সুন্দরবনে পার্শে মাছের রেণু পোনা ধরার জন্য বনে প্রবেশ করেছে চোরা শিকারিরা। এক একটি ট্রলার যখন ফিরে আসবে তখন তাতে অর্ধ কোটি টাকার পোনা থাকবে বলেও জানা গেছে। চলতি গোন শেষেই এসব ট্রলারগুলো খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান ফরেস্ট অফিসের সামনে থেকে (আড়–য়া শিবসা নদীপথে) আলমতলায় আসবে।

জানা যায়, বঙ্গপোসাগরের মোহনা এবং সুন্দরবনের দুবলা, মেরালী, আলোরকোল, কানারমাথা, ভেদাখালী, মানিকখালী, নীলবাড়িয়া, নারিকেলবাড়িয়া, শেলা হেড অফিস, টিয়েরচর, কেল্লার খাল, কেরাংভাঙা, মানিকখালীতে ছোট ছোট খালের মধ্যে দিন জাপন করছে এসব শিকারিরা। রাতের আধারে পার্শে মাছের রেণু পোনা সাগর মোহনায় অবস্থান নিয়ে থাকে, এ সুযোগে চোরা কারবারিরা নেট জালে ছেকে ট্রলার ভর্তি করে বিক্রির জন্য লোকালয়ে নিয়ে আসে। পাইকগাছা উপজেলার শিববাটি ব্রিজের পূর্বপাসের আলামতলা বাজার সংলগ্ন শিবসা নদীর কূলে ও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঝাপালিয়া বাজার সংলগ্ন নদীর কূলে এসব পোনা বিক্রি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে চোরা কারবারিরা জানান, শুধু সাদা মাছ ধরে বিক্রি করলে চালান বাঁচে না। তাই বাধ্য হয়েই পার্শে পোনা ধরতে হয়। এ জন্য মোটা অংকের টাকা বন বিভাগের কর্মকর্তা, ফরেস্টগার্ড, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিতে হয়।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শোয়েব আহমেদ বলেন, কোনো জেলেই পার্শে পোনা ধরবে না। ধরলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বসিরুল আল মামুন বলেন, সুন্দরবনে নেট জাল দিয়ে মাছ ধরা নিষেধ। এই কাজ প্রতিহত করতে আমি কোস্টগার্ডকে চিঠি দিয়েছি। তবে এই বিষয়ে মৎস্য বিভাগকেও এগিয়ে আসতে হবে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে তার বিরুদ্ধেই তদন্ত হবে। আমি কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না।

মানবকণ্ঠ/আরএ