সুদের হার কমার আশঙ্কায় সঞ্চয়পত্র কেনার হিড়িক

আসছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হতে পারে, এমন আতঙ্কে সঞ্চয়পত্র কেনায় হিড়িক লেগেছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যদিও পুরো অর্থবছরের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের নয় মাসেই এই খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে সরকারের ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা এক সময় সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আমানতের সুদের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকে নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাই অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ব্যাংকবিমুখ হয়ে সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া আসছে বাজেটে সুদের হার কমতে পারে এমন গুঞ্জনে সঞ্চয়পত্রের কেনা আরো বেশি হারে বাড়িয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। কারণ বাজেট পাসের আগে সঞ্চয়পত্র কিনলে বাড়তি হারেই মিলবে মুনাফা। এ কারণে সঞ্চয়পত্র কেনায় হিড়িক লেগেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর বিষয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজারের ঋণের সুদের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের ঋণের ফারাকটা একটু বেশি হয়ে গেছে। তাই এটাকে রিভিউ করতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত তা বিবেচনায় নিয়েই এটাকে রিভিউ করা হবে। অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্য গ্রাহকদের সঞ্চয়পত্র কেনায় আরো বেশি উৎসাহ জুগিয়েছে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে গতকাল রোববার সরজমিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন বিনিয়োগকারীরা। ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে প্রতিটি গ্রাহকের। দীর্ঘ লাইনে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন রাজধানীর মালিবাগ এলাকার জাহানারা বেগম। তিনি বলেন, ব্যাংকে কিছু জমানো টাকা রয়েছে। ভেবেছিলাম ঈদের পর হাতে আরো কিছু টাকা এলে একবারে সঞ্চয়পত্র করব। কিন্তু এখন শুনছি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আবার কমানো হবে। তাই এখনই সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছি। কোন ধরনের সঞ্চয়পত্র কিনবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হারই সবচেয়ে বেশি। তাই এটিই কিনব।

সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মহাব্যবস্থাপক মো. মাছুম পাটোয়ারী বলেন, আগামী মাসে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমতে পারে অনেকে এমন আশঙ্কা করছে। এ ছাড়া ব্যাংকে আমানতের সুদের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকেই সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য গ্রাহক ভিড় করেছে। এত লোক যে আমাদের অফিসাররা তাদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। চলতি মাসের ২০ তারিখের পর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে। বাজেট ঘোষণা পরবর্তী অর্থাৎ আগামী মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এ বিক্রি অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমাবে না সরকার। উল্টো সঞ্চয়কারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সারাদেশের সঞ্চয়পত্রের অফিসগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। যাতে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্র ক্রয়, নগদায়ন এবং মুনাফা তোলার জন্য অফিসে যেয়ে, ঘরে বসেই অনলাইনে করা যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলত স্বল্প এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক সামর্থ্যবান মানুষও এ খাতে বিনিয়োগ করছেন। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে মিসইউস হচ্ছে কিনা অর্থাৎ সামর্থ্যবান মানুষরাও এ খাতে বিনিয়োগ করছে কিনা সেটা সরকারকে কঠোর অবস্থানে নজরদারি করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সুদহার বেশি হওয়ায় এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকায় বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছেন গ্রাহকরা। আর এক্ষেত্রে সাধারণত স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই এ খাতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকেন। এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেশি হলে সুদ পরিশোধের দায়ও বেশি হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার তো জনগণের করের টাকা থেকেই এই সুদ পরিশোধ করবে, যেটা কিনা জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে। তবে এ খাতে অপব্যবহার হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া ঋণ সরকারকে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে।

একই বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ক্রমাগত কমতে থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়পত্র ছাড়া আর কোনো লাভজনক বিকল্প পাচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা। এতে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাজেট ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল ঋণের চাপে সরকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, তা এড়ানোর পথ ‘একটাই’। সেটা হচ্ছে সুদের হার কমানো। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ‘পেনশন’ এবং মহিলাদের জন্য ‘পরিবার’ সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি। সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে মোট বিনিয়োগ এসেছে ৬০ হাজার ১২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৪১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে কেবল মুনাফা পরিশোধেই ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। মূল ও মুনাফা বাদ দিয়ে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ৯ মাসে সঞ্চয় স্কিমগুলোর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে পরিবার সঞ্চয়পত্র থেকে। এ খাতে গত ৯ মাসে নিট ঋণ এসেছে ১৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা। এর পরে রয়েছে তিন-মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, নিট ঋণ ১০ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। পেনশন সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে ৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে ২ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিনিয়োগ। তাই বিনিয়োগের ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করে থাকে। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতিমাসে মুনাফা দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

অধিদফতরের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

মানবকণ্ঠ/এএএম