সিসিফাস শ্রম

সিসিফাস শ্রম

আজ বৃষ্টি নামার পর ওর মনে হলো, ও বোধহয় মরেই যেত। লাল বেঢপ নাক নিয়ে যে ভোরে ও পৃথিবীর সবচেয়ে স্যাঁতস্যাঁতে আর গুমোট ঘরে এলো তখন বাহিরে ভ্যাপসা গরম আর ছিনালি ঝির ঝির বৃষ্টি মিলে ইঁদুরে খাওয়া পাউরুটির মতো গ্রামকে নরক করে তুলেছে। ওর প্রৌঢ় বাপ তড়িঘড়ি করে আযান দিতে গিয়ে যখন দেখলো তার কানে অর্ধ খাওয়া একটা বিড়ি রয়েছে তখন ও চিৎকার শুরু করল পুরো নরক কাঁপিয়ে। আর যেদিন ও নিজের দৈর্ঘ্যরে চারগুণ দূরত্বে প্রস্রাব করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সেদিন একটা নতুন নাম পেল।

আজ এত বছর পর এই বৃষ্টি ওকে নিয়ে গেল উঠোনের কোনে ভেন্না গাছতলায়, যেখানে মা একঘেয়েমি জন্মের অভিশাপ নিয়ে কষ্টের ধানগুলোকে শেষ রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছে। যেভাবে নিরীহ সজারু তার জন্মে কাঁটা নিয়ে বাঘের ধ্বংসাত্বক মাংসাশী থাবা থেকে নিজেকে নিস্ফল বাঁচানোর চেষ্টা করে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে ও গুটিসুটি হয়ে যেত, যেমন বিপদে কেন্নো পেলব পয়সা হয়। ওর মনে হতো আকাশ বুঝি লম্বা লেজ পেঁচিয়ে ওকে তুলে নেবে। তখন হয়তো ওকে একটানে মেঘের মধ্যে চুবিয়ে মারবে, কিংবা ছুঁড়ে ফেলবে হাটের রাস্তায় বটগাছটার তলে, যেখানে এক সন্ধ্যায় ওর বাপ বলেছিল, “তুই চুপ করি বসি থাক, আমি এট্টু হেগি আসি”। আর সাত বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন বারান্দার খুঁটি ধরে ও যখন উঠোনের প্রতিটি গুবরেপোকার গর্তে সেচের সমবন্টন করতো, তখন ওর জীর্ণ কাথাটি ভিজে এলিয়ে পড়তো ছানার জিলাপীর মতো। ফলে প্রতিবেশীদের তাক লাগিয়ে পাওয়া ‘বাঘা’ নামটি ততদিনে প্রস্রাবে ভিজে ভিজে একটা আস্ত মুখভর্তি দাড়ি গজানো ধাড়ি ছাগল হয়ে উঠেছে।

এই কথা ভেবে আফছার মিয়ার আজ মাথায় খুন ধরে গেল। দেখলো, বিছানায় নেতানো দাদি নিচের ঠোঁট চিৎ করে একমুঠো তামাক পুরতে পুরতে বলছে “ও-রে আপছার মিয়া তোর চোকে কি কেতু পুকা পড়িচে, কুকরু ধানগুনু খেয়ি ফেল্লু আর তুই থোপা নাচাই বেড়াচ্চিস।’’

জন্মের পর দাদি বাঁশের চাঁচ দিয়ে নাড়ি কেটে অপুষ্ট আর ক্লান্ত শিশুটির মুখে দুর্গন্ধ থুথু ছিটাতে ছিটাতে গদগদ সুরে বলেছিল, “এ-ব্যাটার নাম রাকলাম আফছার মিয়া”। “ন্যাস্টি ওল্ড ফিলো, একটা শিশুর নাম কখনো আফছার মিয়া হয়!” নব্বই বছরের ছাপ লাগানো এই নাম তাকে বিড়ম্বনা দিয়েছে সারাজীবন। গতপরশু নেহাল সাহেবের বাসায় গেট টুগেদার পার্টিতে মিসেস আফছার বলার পর থেকে প্রিয়ন্তী ওর শয্যা ত্যাগ করেছে। এখন আফসোস হলো অন্তত বাঘা নামটি থাকলেও খারাপ হতো না। মিসেস বাঘা চমৎকার হতো!

এখন আকাশ আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি বিয়োচ্ছে বেহায়ার মতো। আফসার মিয়ার ইচ্ছা করল তেল চিটচিটে কলাপাতা রঙের সেই জীর্ণ বহুবর্ষী শার্টটি দিয়ে আকাশকে মুড়িয়ে দিতে। স্বপ্নের ঘোরে জীবনের প্রথম শার্টটি পাওয়ার পর ওর অনেকদিন ঘুম হয়নি। শার্টটি পরলে ওর গোড়ালি থেকে পায়ের পাতা পযর্ন্ত সুস্পষ্ট দেখা যেত! ওর মা খুশি হয়েছিল আরোও বেশি কারণ পরবর্তী কয়েকবছর তাকে আর প্যান্টের চিন্তা করতে হয়নি। একটা চমৎকার ফুলের নকশা ছিল তাতে। গোড়ালি থেকে একটা লতা পেঁচিয়ে উঠেছিল ওর কোমর পর্যন্ত তারপর প্রশাখা গজিয়ে একটা গিয়েছিল পিঠের দিকে আর একটা ওর গলা পর্যন্ত উঠেছিল মস্ত বড় ফুল নিয়ে। প্রতিবার শার্টটি পরার পর ফুলটি থেকে আলাদা আলাদা গন্ধ বেরোতো। আর গন্ধ যখন চরমে উঠতো তখনই কেবল শার্টটিকে ক্ষার আর গরম পানিতে চুবানো হতো। সে স্বপ্নের ঘোর আফসার মিয়ার কেটেছিল বহুদিন পর যেদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখলো হেরমত নাপিত উরু পর্যন্ত লুঙ্গি তুলে দুই হাঁটু ফাঁক করে সাইকেলের একটা পিতলের বেলের প্রাগৈতিহাসিক বাটিতে ক্ষুর আর ফিটকারি চুবিয়ে ওর অপেক্ষায় বসে আছে। এক ঝটকায় ওর মাথাটি চালান করে দিয়েছিল তার দুই হাঁটুর ফাঁকে, ও বিরক্তি আর বিস্ময়ে তাকিয়েছিল হেরমতের বিষন্ন বাদুড় ঝোলা জগতের দিকে।

আট সন্তান জন্ম দিয়ে ওর মা হাপিয়ে উঠেছিল। মায়ের শীর্ণ টোপ খাওয়া হাঁড়ির মতো মুখটা ভেসে উঠল আফসার মিয়ার সামনে। ছাগলের মুখে দুটো কাঁঠালের ডাল কেটে দিয়ে, মা তালপাতায় ছাওয়া চুলোয় পোয়াখানেক চাল বসিয়ে দিয়েছে। ভাতের হাঁড়িটা এমন বেঢপ আর বড় ছিল যে চালগুলো ঢাললে ওটা শুড়শুড়ি পেত মাত্র। উষ্ণ আর শীতল স্রোতে ঘোল মেরে চালগুলো ভেসে বেড়াতো মহাসমুদ্রে। খাওয়ার সময় রীতিমতো যুদ্ধ বেঁধে যেতো ভাতের ফেন নিয়ে। আর যুদ্ধে সবচেয়ে অসহায় ভাবে পরাজিত সৈন্যটিকে মা পরম মমতায় তুলে দিত তার নিজের ভাগের সামান্য ফোনটুকু। এখন দেশ বিখ্যাত আফসার মিয়া গলায় ন্যাপকিন ঝুলিয়ে স্যুপে চুমুক দিতে গেলেই দেখে একঘেয়েমী কাঁঠাল পাতা ছেড়ে ছাগলটা ওর দিকে তাকিয়ে ম্যাঁ ম্যাঁ করছে।

মায়ের মৃত্যুর সময় আফসার মিয়া মাকে যেন চিনতে পারেনি ঠিকমতো, মুখটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে থেকে কালো হয়ে যাচ্ছিল। বাহিরে তখন মাতাল সূর্য আগুন ছুড়েছে। সেবার মাঠ ফেটে পড়েছিল পাকা ঢ্যাপের মতো। ধানের শীষগুলোর তখনো ঠিকমতো চোখ ওঠেনি। গর্ভ থেকে মাথা তুলে সবেমাত্র বাতাস শুকতে শুরু করেছে। কদিনের মধ্যেই ভাগাড় হয়ে উঠেছিল সমস্ত মাঠ। অকালে ভূমিষ্ঠ মৃত শিশুর মতো শীষগুলো মরে শুকিয়ে উঠলো কিন্তু পচতে পারলো না ! আফসার মিয়া দেখলো নোনা গাছ তলায় একটা ছেঁড়া পাটিতে শুয়ে মা হিক্কা তুলতে তুলতে সারা বাড়ি মাথায় করে তুলেছে, হিক্কার সঙ্গে বারকয়েক রক্ত বেরোলো তারপর বড় বড় চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল মা। শীত আসতে আসতে ওর বাপ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তখন সে প্রতিদিন গোসলের সময় মাথায় এঁটেল মাটি ঘষতে শুরু করেছে।

আর যেদিন আতরে তুলা চুবানোর জন্য বালিশ ফুটো করতে গিয়ে ধরা পড়ল, সেদিন সদ্য গোঁফ গজানো বালকের মতো ঘড়ঘড়ে গলায় সে বলেছিল, “এই ঠান্ডায় খ্যাতার মদ্দি এট্টা পুরুষ মানুষ কী করি থাকে, একলা থাকলি কী খ্যাতা গরম হয়।” মায়ের মৃত্যু ও বাপের বিয়ের পর আফসার মিয়া একটা নিজস্ব জগত পেয়েছিল। কারণ মায়ের কঞ্চির মতো হাতের চড় যেমন সকাল সন্ধ্যা আর খেতে হয়নি তেমনি বাপ রোগগুলো কবিরাজের কাছ থেকে লতাপাতার পাচন নিয়ে তাজা বউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

আফসার মিয়া ভেলভেটের পর্দাটা সরিয়ে দেখলো বৃষ্টি কমেছে কিনা। কিন্তু তখনও বৃষ্টির এমন মেজাজ যেন অনন্তকাল ধরে সে আফসার মিয়াকে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর করতে থাকবে। আফসার মিয়া এই পতন থেকে বাঁচতে অন্যদিকে মনোযোগ দিল।

বেলজিয়াম থেকে আনানো পিওর মিনারেল ওয়াটার ঢাললো গ্লাসে তারপর তাতে আভিজাত্য লাগিয়ে একটা চুমুক দিল। ‘ডে সিডিউল’ বুক বের করে আগামীকালের কর্মসূচিগুলো দেখে নিল। কিন্তু যখন বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকালো তখন ও সবকিছু ছুঁড়ে দুই কানে আঙুল দিয়ে বসে পড়ল। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকবে ও জানে না। হয়তো মা ওকে খুঁজছে, চৌকির নিচে যেখানে ঝোলাগুড়ের ভাড়টা কাত হয়েছে মাত্র। অজস্র পা ওকে চেপে ধরল, শতশত কামড় পড়ল ওর অসহায় চোখের পাতায়, কানের গোলকধাঁধায়। দলের সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পিঁপড়াগুলো হাতে টর্চ না নিয়েই ঢুকে পড়ল ওর নাকের অন্ধকার সুড়ঙ্গে, ক্ষুধার্ত পিঁপড়াগুলো দৌঁড় দিল ওর পিঠের নিচে যেখানে গুড়ের অলস স্রোত বাঁধা পেয়ে জিরিয়ে নিচ্ছিল। আফসার মিয়া দেখল লাখ লাখ পিঁপড়া “আলীরে আলী হেইয়ো” স্লোগান দিয়ে ওকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে অতল অন্ধকারে।

লেখক: এমএ (বাংলা বিভাগ ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/ইএন

2 Responses to "সিসিফাস শ্রম"

  1. রেবা রহমান   26/05/2018 at 12:13 PM

    ভালো লিখেছেন আপনি। খুব উঁচুমানের সাহিত্য। আপনার আরো লেখা পড়তে চাই ভবিষ্যতে। অপেক্ষায় রইলাম।

  2. মুহূ মেসবাহ   01/06/2018 at 12:42 AM

    Very impressive writing. Your amazing literary sense is mind blowing. Keep it up.