সিলেবাসে নেই

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেছেন এমন একজন ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করেছিলাম সে ভালোভাবে উত্তর দিতে পারেনি। তখন তাকে বলেছিলাম সে ইংরেজি বলতে পারে না। নিশ্চয়ই ইংরেজি শুনে বুঝতে পারে। সে জানায় তাদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ইংলিশ স্পোকেন বা লিসেনিং শেখানো হয় না। তখন তাকে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করি। উত্তরে সে জানায়, এগুলো তাদের সিলেবাসে নেই। তাদের সিলেবাসে কিছু কবিতা গল্প উপন্যাস নাটক গ্রামার পড়ানো হয়। সিলেবাসের বাইরে কিছু পড়ানো হয় না, পরীক্ষায়ও আসে না। তাই এসবের উত্তর তার জানা নেই। ছাত্রছাত্রীরা সিলেবাসটাও ভালোভাবে পড়ে না। প্রতিটি সাবজেক্টের সিলেবাসের নিচে কিছু সহায়ক গ্রন্থের নাম থাকে। সংখ্যায় একদম কম না।

সিলেবাসটাকে ভালোভাবে বোঝার জন্য ঐ বইগুলোর নাম দেয়া হয়। সে সব বই পড়লে সিলেবাসটা আরো সহজ হয়। সেই ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ঢাকার একটি ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওরিএন্টেশন ক্লাসে লালমাটিয়া শাখায়। সে এসেছিল ইজি স্পোকেন ক্লাসে ভর্তি হতে। এ অবস্থা যে শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর তা কিন্তু নয়। হাতে গোনা কয়েকটি বাদ দিলে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও খুব বেশি উন্নত নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তারা দু’চার লাইন ইংরেজি বলতে পারে (তাদের এই বলতে পারাটাকে আমি পজিটিভ হিসেবেই দেখতে চাই)। ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করে ইংরেজি বলতে বা বুঝতে পারে না। এ লজ্জা তাদের না। এ লজ্জা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। আমাদের সবার।

যদিও বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি পাস কোর্স ঐচ্ছিক বিষয়ে ৪০০ নম্বরের পরিবর্তে ৬০০ নম্বর করা হয়েছে। মাস্টার্স ১০০০ নম্বরের পরিবর্তে ১৩০০ নম্বর । প্রিলিমিনারিতে ৫০০ ও ফাইনালে ৮০০ নম্বর। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সিলেবাসের কলেবর বৃদ্ধি করেছে এবং করছে। এটা ভালো উদ্যোগ। অনেক ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হলেই সেই সব বিষয় ছাত্রছাত্রীরা শিখতে পারবে ভালোভাবে। তাই এখন সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তির দিকে জোর দেয়া হচ্ছে।

আর এ অবস্থায় আমাদের সমাজের অনেক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকও মনে করছেন তাদের রচনাও সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। নিজে উদ্যোগী হয়েও অনেকে অন্তর্ভুক্ত করছেন। এ কাজ শিক্ষাবোর্ড বা সরকারের।

আমার পরিচিত একজন সাংবাদিক ও ছড়াকার মারা গেছেন। তিনি ভালো ছড়া লিখতেন এতে সন্দেহ নেই। মৃত্যুর পর তার পরিবারের দাবি ছিল তার টেন্স বিষয়ক ছড়াটা যেন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ছড়াটা আমি পড়ে দেখেছি সেটা কোন নোটবই, গাইড বই বা ব্যক্তিগতভাবে লেখা কোনো বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই ধরনের দাবি উঠেছিল আমার পরিচিত সিনিয়র একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর পর প্রেসক্লাবে মিলাদ মাহফিলে। তার লেখাও আমি পড়ে দেখেছি। সিলেবাসে দেয়ার মতো না বা সরকারিভাবে সংরক্ষণ করার মতো না। বড়জোর এগুলো পারিবারিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কোনো প্রকাশনী বই আকারে বের করতে পারে। এর চেয়ে বেশি কিছু না।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রমে ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করতে মাদকের খারাপ বা ভয়াবহ দিক তুলে ধরা হবে। অর্থাৎ বিষয়টি সিলেবাসে থাকবে। এখন সমাজে কোনো অন্যায় বা অসঙ্গতি ঘটলে সেটা রোধ করার জন্য বলা হচ্ছে সেই বিষয়টা সিলেবাসে দিতে। ভাবখানা এমন সিলেবাসে দিলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এত এত বিষয় কি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। সমাজে মাথাচারা দিয়ে উঠেছে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, আইটি বিষয়ক অপরাধ। এর পাশাপাশি রয়েছে ভূমিকম্প, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। খাদ্যদব্যে ভেজাল, অজ্ঞান পার্টি, ফরমালিন, ট্রাফিক আইন আরও কত কি নতুন নতুন যুক্ত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক ও বিভিন্ন দিবসের তাৎপর্যও সিলেবাসে দেয়া উচিত। সব কিছু সিলেবাসে থাকে না। সব বিষয় সিলেবাসে দেয়াও সম্ভব না। সিলেবাসে সব কিছু দিতে গেলে বইয়ের আকার বিভিন্ন আলোচিত মামলার নথির চেয়েও বড় আকার ধারণ করবে এক একটি বই। যেটা বহন করা কারো একার পক্ষে সম্ভব না। বইয়ের ভারি বোঝা কমানোর কথা বলে সিলেবাসের বোঝা ভারি করতে চাচ্ছেন অনেকে। সিলেবাস ভারি হলেই জ্ঞান বৃদ্ধি হয় না। সমস্যারও সমাধন হয় না। এ কথাটা অনেক শিক্ষাবিদরাও বুঝতে চাচ্ছেন না। তারা ভাবছেন সিলেবাসে দিলেই তাদের দায়-দায়িত্ব শেষ।

আসলে সিলেবাসের বাইরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রকৃত শিক্ষা বা বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার। সিলেবাসে থাকে নামমাত্র কিছু শিক্ষার নিদর্শন বা দিকনির্দেশনা। সিলেবাস একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সিলেবাসের বাইরের বিষয়গুলো শিখতে হয় পরিবার, সমাজ, সংঘ বা রাষ্ট্র থেকে। সিলেবাসের বাইরে বই পড়ে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে মিডিয়ার মাধ্যমে। মানুষের সাথে মেলামেশা করে বা খেলাধুলা করে। সমাজ সেবা করে। ধর্মীয় কাজে সম্পৃক্ত হয়ে। স্বেচ্ছাশ্রম বা সেবামূলক কাজ করে। আরও নানাভাবে শেখার সুযোগ রয়েছে। হাতে কলমেও শেখে ছাত্রছাত্রীরা মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি কখনো পাড়া প্রতিবেশি বা সিনিয়র সিটিজেনদের কাছ থেকেও। এ শিক্ষা হয় কখনো মতামত পরামর্শ বা আদেশ নির্দেশ হিসেবেও। প্রকৃতির কাছ থেকেও মানুষ শেখে প্রতিনিয়ত। প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হলে প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’কবিতাটি। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র/ নানাভাবে নতুন জিনিস, শিখি দিবারাত্র/এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,পাঠ্য যে সব পাতায় পাতায়/ শিখছি সে সব কৌতূহলে, নেই দ্বিধা লেমমাত্র।

সিলেবাসের মাধ্যমে সবকিছু জানানো যায় না। সেটা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। সব বিষয় সিলেবাসে দিয়ে সিলেবাসকে ভারাক্রান্ত না করে সিলেবাসের বাইরে এসেই শিখতে হবে। এ শিক্ষাকেই বিশেষভাবে উৎসাহিত করা উচিত। ছাত্রছাত্রীরা যেন এটা বলার সুযোগ না পায় কোন প্রশ্নের উত্তরে যে আমাদের ‘সিলেবাসে নেই’।
– লেখক : রম্যলেখক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.