সিরিজ ব্লগার কিলিং মাস্টারমাইন্ড মেজর জিয়া লাপাত্তা!

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বা আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখাপ্রধান সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া। এই শীর্ষ জঙ্গিনেতার সব লেখক-ব্লগার হত্যার মাস্টারমাইন্ড। তার নির্দেশেই দেশে সিরিজ ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সময় দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ড. অভিজিৎ রায়সহ সিরিজ লেখক-ব্লগার হত্যার পর গত চার বছরেও রহস্যময় জিয়ার নাগাল পায়নি পুলিশ ও র‌্যাব।

২০১৬ সালে তাকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও (অভিজিৎ হত্যা: ৬ আসামী অভিযুক্ত করে চার্জশিট: পৃষ্ঠা-১২) ঘোষণা করে পুলিশ সদর দফতর। কিন্তু এই শীর্ষ জঙ্গিনেতা জিয়া এখন পর্যন্ত লাপাত্তা। দীর্ঘ চার বছর পর গতকাল প্রকৌশলী ও লেখক ড. অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় বরখাস্তকৃত মেজর জিয়াসহ ৬ এবিটি জঙ্গির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। বিষয়টি জানিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন, ‘ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম।’

এ সময় জঙ্গিনেতা জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘২০১৫ সালে লেখক-ব্লগার হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ড সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া এখনো পলাতক রয়েছে। তার সাংগঠনিক নাম সাগর ওরফে ইশতিয়াক ওরফে বড় ভাই। তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নতুন করে জঙ্গি হামলার সক্ষমতা হারিয়েছে জিয়ার নেতৃত্বাধীন জঙ্গি সংগঠন এবিটি। জঙ্গিনেতা জিয়াকে ধরতে দীর্ঘদিন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’

সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এখনো রহস্যের মধ্যেই রয়ে গেছে শীর্ষ জঙ্গি নেতা মেজর জিয়া। তিনি কোথায় আছেন-এমন প্রশ্নের সঠিক জবাব নেই পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে। ২০১৬ সালের আগস্টে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষিত এই জঙ্গি নেতাকে ধরতে সারাদেশে অভিযান চালালেও বার বার ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ সালে বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক-প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যার প্রেক্ষাপটে বরখাস্তকৃত মেজর জিয়ার নাম আলোচনায় আসে। এ ছাড়া গুলশান, শোলাকিয়া ও কল্যাণপুরে ঘটনার মূল হোতাদের মধ্যে মেজর জিয়া ছিলেন অন্যতম।

২০১৬ সালের অক্টোবর হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, ব্লগার হত্যার মাস্টারমাইন্ড মেজর জিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে সে ধরা পড়বে। সেদিন ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এ কথা বলছিলেন, তখন গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও আশুলিয়ায় জঙ্গি আস্তানায় একযোগে অভিযান চালাচ্ছিল পুলিশ ও র‌্যাব। ওই অভিযানগুলোতে ১২ জঙ্গি নিহত হয়। এরপর থেকে জিয়ার অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়।

এরপর বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে জানানো হয়, শিগগিরই জঙ্গিনেতা জিয়া গ্রেফতার হতে পারে। তাকে গ্রেফতারে টানা অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও র‌্যাব। কিন্তু গত চার বছরেও তার হদিস মেলেনি। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে, শীর্ষ জঙ্গি নেতা জিয়া আসলে কোথায়? তবে জিয়ার সহযোগী কয়েক জঙ্গি ইতোমধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

২০১৫ সালে এবিটি জঙ্গিদের ধারালো চাপাতির আঘাতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারান মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী ড. অভিজিৎ রায়, তার বইয়ের প্রকাশক ও জাগৃৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপন, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডের কর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিম উদ্দিন সামাদ।

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিম বা আনসার আল ইসলামের (এবিটি) স্লিপার সেলের দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা জড়িত বলে জোর দিয়ে একাধিকবার জানিয়েছেন পুলিশ ও র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আর মূল মাস্টারমাইন্ড (পরিকল্পনা) পলাতক মেজর জিয়া। কে এই বহিষ্কৃৃত মেজর জিয়াউল হক : ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তৎকালীন মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উৎখাতে ধর্মান্ধ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়। তখনই প্রবাসী ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ ও মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকের নাম আসে, যারা ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়।

এরপর দেশে একের পর এক ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক-প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যার প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের মধ্যভাগ থেকে আবারো জিয়ার নাম আলোচনায় আসে। তার পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তার বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। প্রায় আড়াই বছর আগে সর্বশেষ ব্যবহৃত বর্তমান ঠিকানা পলাশ, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা। তার বাবা বারিধারা ডিউএইচএস এলাকায় বসবাস করতেন। শীর্ষ জঙ্গি জিয়ার শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলায়।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে আত্মগোপনে থেকে জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) আধ্যাত্মিক নেতা শাইখ জসিমউদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ধীরে ধীরে ২০১৫ সালে এবিটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা হয়ে ওঠেন। জিয়ার কমান্ডো ট্রেনিং রয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

সিরিজ ব্লগার হত্যার আগে প্রায় শতাধিক জঙ্গি সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেন জিয়া। গোয়েন্দাদের কাছে খবর আছে, দেশে বা বিদেশে আত্মগোপনে থেকেও সক্রিয় এই জঙ্গিনেতা। তবে জঙ্গি সংগঠনটির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার দলের অনেক সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। আর কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ইদানীং জিয়ার কোনো হদিস মিলছে না। আগে এক সময় ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় তাকে গোয়েন্দা জালে আটকানো যায়নি।

মানবকণ্ঠ/এএম