সিরাজ লুৎফার অমর ভালোবাসা

সিরাজ-উদ-দৌলার স্বপ্ন রঙে তৈরি হীরাঝিল প্রাসাদ। পারস্য ও দেশীয় লোকেরা দিন-রাত এক করে দীর্ঘদিন এর নির্মাণকাজ শেষ করেন। বছরজুড়ে ফোঁটা ফুলগুলো ‘হীরাঝিল’ বাগানকে বেশ মোহনীয় করে তোলে। সারাবছর ফুলের সমারোহ ছিল বলেই অনেকে একে হীরাঝিল বসন্ত উদ্যান বলতেন। হীরাঝিলে ছিল সারিবদ্ধ লতা গুল্মের বিন্যাস, জলধারা, ঝরনা, বিশাল তোরণ, খোলা বারান্দা, সুরম্য প্রাসাদ। এখানকার তরুচ্ছায়া সিরাজ-উদ-দৌলা, বেগম লুৎফুন্নেসার পড়ন্ত বিকালের আড্ডাকে বেশ জমিয়ে তুলত। তারা কান পেতে শুনতেন ঝরনার কোলাহল, বাতাসের কানাকানি, গাছের কথা, ফুলের মিষ্টি হাসি। তাদের বিবাহ হয় ১৭৪৫ সালের পহেলা ফাল্গুন। আজো তাদের প্রেম অমর হয়ে আছে-

আলিবর্দী খান তার নবাবি আমলে দু’বাংলায় গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ ও বাগানবাড়ি। শুধু নবাব আলিবর্দী নন, তার অতি আদরের নাতি সিরাজ-উদ-দৌলা, যার জন্ম ১৯-০৯-১৭২৭, তৎকালীন দু’বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ। তিনিও কিশোর বয়সেই চিরসবুজ উদ্যান সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। নবাব আলিবর্দীর নবাবি আমলে অসংখ্য ইরানি কারিগরদের সুনিপুণ বাহারি সোনা-রুপার কারুকার্য ও নিখুঁত কাচের কজে সেজেছিল, সিরাজের স্বপ্ন রঙে তৈরি হীরাঝিল প্রাসাদ। পারস্য ও দেশীয় লোকেরা দিন-রাত এক করে দীর্ঘদিন এর নির্মাণকাজ শেষ করেন। কৃত্রিমভাবে তৈরি টিলার ওপর লাগানো বছরজুড়ে ফোঁটা ফুলগুলো ‘হীরাঝিল’ বাগানকে বেশ মোহনীয় করে তুলেছিল। সারাবছর ফুলের সমারোহ ছিল বলেই অনেকে একে হীরাঝিল বসন্ত উদ্যান বলতেন। আলিবর্দী থেকে সিরাজ-উদ-দৌলার নবাবি আমলে হীরাঝিলে ছিল সারিবদ্ধ লতা-গুল্মের বিন্যাস, জলধারা, ঝরনা, বিশাল তোরণ, খোলা বারান্দা, সুরম্য প্রাসাদ। এখানকার তরুচ্ছায়া সিরাজ-উদ-দৌলা, বেগম লুৎফুন্নেসার পড়ন্ত বিকালের আড্ডাকে বেশ জমিয়ে তুলত। তারা কান পেতে শুনতেন ঝরনার কোলাহল, বাতাসের কানাকানি, গাছের কথা, ফুলের মিষ্টি হাসি। আর মন ভরে উপভোগ করতেন চারপাশের বিচিত্র পাখি আর ফুলদের বর্ণময় শোভা।

হীরাঝিলে যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসা নিজ হাতে পারস্যের রকমারি ফুল ও ফলের বৃক্ষ রোপণ ও ফুলের বাগান তৈরি করেন। বছরজুড়ে ফোঁটা সিরাজের প্রিয় ইরানি ফুলগুলো ‘হীরাঝিলের’ বাগানকে বেশ মোহনীয় করে তুলেছিল। পারস্যের গোলাপ, নাসরিন, ইয়াস, নার্গিস ‘হীরাঝিল’র অন্যতম আকর্ষণ ছিল। যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসা পশুপাখি ভালোবাসতেন। ভোরে উঠেই নামাজ পড়া, কোরআন পাঠ করার নিয়মিত অভ্যাস ছিল বাংলার যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার। তারা সৃষ্টিকর্তার সুন্দর সৃষ্টিকে ভালোবাসতেন, তাই নামাজ ও কোরআন পাঠ শেষে একসঙ্গে উন্মুক্ত পাখিদের খাবার দিতেন, ফুল ও ঔষধি গাছের পরিচর্যা করতেন নিজ হাতে, সেই সঙ্গে প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভে আনন্দ পেতেন। সেইসব দিনে হীরাঝিলের পাশে সিরাজ ও লুৎফার প্রিয় হরিণ, ময়ূর, টিয়াদের অবাধ বিচরণ ছিল।

হীরাঝিলের বাগানে সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসা ঐতিহ্যের ছোঁয়া লাগিয়েছেন- ঝরনার মর্মর, ছায়া ও বর্ণের প্রাচুর্য, প্রশস্ত জলাশয়ের ফোয়ারার পাশে কালো পাথরের মঞ্চ, পাথর বাঁধানো সরু জলাধারে স্তরে স্তরে লাফিয়ে পড়া জলের শব্দ, ফেনার শুভ্র উদ্ভাস, প্রাসাদঘেরা বাহারি গোলাপ ঝাড়, হাস্যোজ্জ্বল সূর্যমুখী ফুল, কার্পেটের মতো নরম ঘাসের চত্বর, মাঝখানে আমগাছ। সেইসব দিনে হীরাঝিলের বাগানে বসেই জমে উঠত যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসাকে ঘিরে আলাপ-আলোচনা, সঙ্গীত সন্ধ্যা ও কাব্যচর্চার রঙিন আসর। ১৭৪৫ সালে যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার বিবাহ উৎসবে সুদূর ঢাকা, চট্টগ্রাম, ইরান, ইরাক থেকে বহুসংখ্যক আত্মীয়স্বজন, আমির-ওমরা, শায়ের-কবি ও আমত্যবর্গ যোগদান করেন। নবাব আলিবর্দী অতিথিদের প্রত্যেককে ইরানি সুগন্ধি উপহার হিসেবে বিতরণ করেন।

১৭৪৫ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি (১ ফাল্গুন) যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয় তৎকালীন দু’বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। সিরাজের স্বপ্ন রঙে তৈরি হীরাঝিল প্রাসাদ। পারস্য ও দেশীয় লোকরা দিন-রাত এক করে দীর্ঘদিন এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন। কৃত্রিমভাবে তৈরি টিলার ওপর লাগানো বছরজুড়ে ফোঁটা ফুলগুলো ‘হীরাঝিল’ বাগানকে বেশ মোহনীয় করে তুলেছিল।

সারাবছর ফুলের সমারোহ ছিল বলেই অনেকে একে হীরাঝিল বসন্ত উদ্যান বলতেন, আলিবর্দী থেকে সিরাজ-উদ-দৌলার নবাবি আমলে হীরাঝিলে ছিল সারিবদ্ধ লতা গুল্মের বিন্যাস, জলধারা, ঝরনা, বিশাল তোরণ, খোলা বারান্দা, সুরম্য প্রাসাদ। এখানকার তরুচ্ছায়া সিরাজ-উদ-দৌলা, বেগম লুৎফুন্নেসার পড়ন্ত বিকালের আড্ডাকে বেশ জমিয়ে তুলত। তারা কান পেতে শুনতেন ঝরনার কোলাহল, বাতাসের কানাকানি, গাছের কথা, ফুলের মিষ্টি হাসি। যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয় তৎকালীন দু’বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে।

ওই ঐতিহাসিক বিবাহতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কারবালা, পারস্যের ‘সিরাজ’ প্রদেশ থেকে এসেছিলেন বহু নামিদামি ব্যক্তিত্ব। তাদের আমন্ত্রণে যুবরাজ সিরাজ ও স্ত্রী লুৎফা প্রাণপ্রিয় নানাজান বাংলার বীর নবাব আলিবর্দী খানের জন্ম ও মাতৃভ‚মি পারস্যের ঐতিহ্যবাহী ‘সিরাজ’ প্রদেশ ভ্রমণে আসেন। বিয়ের অল্পদিন পরে বলা যায় মধুচন্দ্রিমায় সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসা ‘সিরাজ’ গিয়েছিলেন। ওই সময় যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসাকে ‘সিরাজ’ শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে গুণীজনরা রাজকীয় সংবর্ধনা দেন।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসা ছিলেন নির্ভীক, ধর্মপরায়ণ, নিরহংকার। নিজেকে আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা মনে করতেন। এ কথা সত্যি যে, সিরাজকে লুৎফুন্নেসা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসার বিনোদন ছিল তার পরিবার-পরিজন নিয়ে গঠিত অন্দরমহল আর প্রিয়জনদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসা খুব অল্পতেই খুশি থেকে, পরম করুণাময় আল্লাহ তা’আলার কাছে নামাজ ও কোরআন পাঠ করে শুকরিয়া আদায় করতেন। আরাম-আয়েশ, কোঠা-বাঈজী, মদ-নেশা এগুলো অসুন্দর জিনিস থেকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হর-হামেশা দূরেই থাকতেন। তিনি যৌবনকাল থেকে পবিত্র সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।

মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি থাকলেও নবাব আলিবর্দী, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, বেগম লুৎফুন্নেসা ও তাদের প্রিয় পরিবার বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-ব্যবহারের অনেক কিছুকেই বড্ড বেশি আপন করে নিয়েছিলেন। তারা ফার্সি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় সমান দক্ষতা রাখতেন। তাই তো যুবরাজ সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসা তাদের প্রিয় পরিবার-পরিজন নিয়ে লাল সবুজের হৃদয়ে বাংলা নববর্ষ, বসন্ত উৎসব, নবান্ন উৎসব ভালোবাসার বন্ধনে পালন করতেন। তারা সব ধর্ম-বর্ণ গোত্রের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তাই তো তাদের নবাবি আমলে সব ধর্মীয় উৎসব পালন হতো হৃদয়ের বন্ধনে। ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিরাজ-উদ-দৌলা নামক ফুটফুটে সুন্দর এক ফুল ফুটল বাংলার বাগিচায়। একই তারিখে (১৯ সেপ্টেম্বর ১৭৩৪ সাল) লুৎফুন্নেসার জন্মদিন থাকাতে ভালোবাসার বন্ধন ছিল অনেক মিষ্টি মধুর। সিরাজের প্রতি লুৎফুন্নেসার ছিল হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।

সিরাজ ও লুৎফুন্নেসা ছোটবেলা থেকেই খুব সহজ সরল। শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। ফুল-পাখিদের আরো বেশি ভালোবাসতেন। সৃষ্টিকর্তার সুন্দর সৃষ্টিকে ভালোবাসতেন। প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভে আনন্দ পেতেন একসঙ্গে। একমাত্র সন্তান উম্মে জোহরাকে ভালোবাসতেন হৃদয় দিয়ে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নেসা ছিলেন বিশাল সুন্দর মনের মানুষ। তাদের দায়িত্ববোধ চিন্তা চেতনাও ছিল ভীষণ সুন্দর। বিপদের সময় বাংলার মানুষের বন্ধু হয়ে পাশে থাকতেন। তাই সিরাজও লুৎফুন্নেসার ভালোবাসা আজো বাংলার চিরন্তনী বেদনার সুর হয়ে বেজে ওঠে প্রতিটি দেশপ্রেমী হৃদয়ে। বাংলার জারি, সারি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালীর সুরে সুরে মিশে আছে সিরাজ ও লুৎফুন্নেসার ভালোবাসার সুর। বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, কিষান-কিষানী, শ্রমিক-মজুর, জেলে, তাঁতী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গুণীজনসহ সব শ্রেণির মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে সিরাজ ও লুৎফুন্নেসার এক নিবিড় আত্মিক স্পর্শ রয়েছে, যার ফলে তাদের ভালোবাসার সুর আজো বেজে ওঠে লাল-সবুজের হৃদয়জুড়ে।

মানবকণ্ঠ/এএম