সিরাজুল হোসেন খান

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, জননেতা ও উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক সাবেক মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খানের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি। সিরাজুল হোসেন খান ১৯২৬ সালের ১৭ জুলাই বানিয়াচং উপজেলার সাগরদিঘীর পশ্চিম পাড়ের (বড় বাড়ি) এক বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ওনার বড় ছেলে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র আরবান স্পেশালিস্ট জাহেদ হোসেন খানের গুলশানের বাসায় বার্ধক্যজনিত রোগে ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সিরাজুল হোসেন খানের পিতা মরহুম আবুল হোসেন খান ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের তুখোড় নেতা ও মেজো চাচা অ্যাডভোকেট নুরুল হোসেন খান মুসলীগ লীগের প্রাদেশিক নেতা এবং আসাম প্রাদেশিক পরিষদে দু’বার এমএনএ নির্বাচিত হন। সিরাজুল হোসেন খান হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে অধ্যয়নকালে বাবা ও চাচার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পথ ধরে স্বদেশি সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব বঙ্গের প্রত্যেক জেলা থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের এডহক কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন দিনাজপুরের নঈম উদ্দিন আহমদ। ফরিদপুরের প্রতিনিধি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, বরিশাল থেকে আব্দুর রহমান, কুমিল্লা থেকে অলি আহাদ, সিলেট থেকে সিরাজুল হোসেন খান। এই মুসলিম ছাত্রলীগ পরবর্তীতে ছাত্রলীগে রূপান্তরিত হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে এমএ পাস করার পর ১৯৫১ সালে দৈনিক অবজারভার থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রচার বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ও ব্যুরো চিফ হিসেবে ক’বছর চাকরি করেন। পরবর্তীতে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ১৯৬১ সালে লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসের ব্যুরো চিফের দায়িত্ব নেন। এক সময় বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে বেসরকারি খাতে সংবাদ সংস্থা নিউজ এজেন্সি এনার প্রতিষ্ঠা ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭২ সালে বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের আমন্ত্রণে লন্ডনে যান। সে সময় সেখানে জার্নাল অব কনটেম্পরারি এশিয়া নামক একটি বিখ্যাত জার্নালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশি বামপন্থিদের কর্মকাণ্ডের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য আর্টিকেল প্রকাশ করেন। ১৯৬৩ সাল থেকেই দেশের বৃহত্তর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি সব দল-মতের শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের যৌথ সম্মেলনে গঠিত ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে পূর্ব পাকিস্তানে সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ও পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এক যোগে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনাব খান জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন থেকে নিজ এলাকা থেকে ঘোড়া মার্কা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন (১৯৪৭ থেকে ৫০ইং পর্যন্ত) ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ সহ কৃষক, শ্রমিক, জেলে ও মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য কায়েমি স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রাম করে গেছেন। সরকারের রোষানলে পড়ে কারাভোগসহ দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। তিনি জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়ভাজন ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সিরাজুল হোসেন খান এবং সভাপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর অন্যতম নেতা ছিলেন। কাগমারী ঐতিহাসিক সম্মেলন এবং ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা লংমার্চের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান এবং ত্রিপুরায় তাদের (বামপন্থি) পার্টির মিলিটারি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ওই ক্যাম্পে তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। তিনি শিলংয়ে বাংলাদেশ মিশনে অবস্থিত লিবারেশন লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ও কলকাতায় সিপিআইএম প্রদত্ত অফিসে অবস্থিত ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে গঠিত জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন (জাগমুই) এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং বাম ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে কয়েকটি বাম দল নিয়ে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক পার্টি, সিরাজুল হোসেন খানের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের লক্ষ্যে ৭ দলীয় জোটে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল করা এবং ভূমি সংস্কার ‘জাল যার জলা তার’, ঋণ সালিশি ব্যবস্থা সংস্কার ও প্রবর্তনের শর্তসাপেক্ষে গণতান্ত্রিক পার্টি অন্যান্য পার্টির সঙ্গে এরশাদের জাতীয় ফ্রন্টে যোগ দেয়। ১৯৮৫ সালের ৩ জুলাই তিনি এরশাদ সরকারের মন্ত্রী সভায় যোগ দেন। পরে জাতীয় ফ্রন্ট জাতীয় পার্টিতে রূপান্তরিত হলে তিনি পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং পার্টি থেকে ’৮৬ ও ’৮৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে আদর্শগত মতবিরোধের কারণে জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন এবং লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। পরে ক’জন শীর্ষস্থানীয় নেতার বিশেষ অনুরোধে ১৯৯৭ সালে বিএনপিতে যোগদান করেন। রাজনীতিতে সুস্থ ধারার ক্রমাবনতির কারণে রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন এবং বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে কলাম লেখাসহ ৬টি গ্রন্থ রচনা করেন। সুদীর্ঘ ৫৮ বছর তিনি ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকায় লেখালেখি করে গেছেন।
আখলাক হোসাইন খান খেলু