সামান্য বৃষ্টিতেই পানিবদ্ধতা অগ্নিকাণ্ডে মিলছে না জলাধার

দেশজুড়ে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও তা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্তভাবে মিলছে না পানির উৎস বা জলাধার। ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে পুকুর ও জলাধারগুলো। এক শ্রেণির দখলবাজরা পাল্লা দিয়ে দখল করে নিচ্ছে এসব। আর তাই রাজধানীতে একদিকে যেমন সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ পানিবদ্ধতা অপরদিকে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা নেভাতে মিলছে না পানির উৎস বা জলাধার।

নগর বিশেষজ্ঞরা এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন এ ব্যাপারে বার বার তাগাদা দিলেও নগরীর পানির উৎস রক্ষায় বা জলাধার পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছেন ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় যেন কিছুই করার নেই তাদের। রাজধানীর খাল, জলাশয় থেকে শুরু করে পুকুর পর্যন্ত প্রভাবশালী দখলদারদের কারণে ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানিসহ হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশ রাস্তা-ঘাট তলিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে জনসাধারণকে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে ডিটেইল এরিয়া প্লান (ড্যাপ) কর্তৃপক্ষ ১৫৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা তথা রাজধানীর ১২ শতাংশ পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মধ্যে পুকুর, খাল এবং লেকসহ অন্যান্য জলাশয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৭ সালে রাজউক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, রাজধানীতে মাত্র ১৭৪৪ একর পানি সংরক্ষণ এলাকা রয়েছে। এর ফলে রাজধানী হয়ে পড়ছে অনেকটা পানিশূন্য। পানি সংরক্ষণে এত স্বল্প জলাধার বিশ্বের আর কোনো রাজধানীতে রয়েছে কিনা, জানা নেই। অথচ এর সজীব এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত জলাধার খুবই জরুরি। এ ছাড়া প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি।

কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। ফার্মগেট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মাহাসরুপা হাসান টুবন বলেন, আমাদের শৈশবের প্রতিদিনের আনন্দে থাকত সবাই মিলে পুকুরে সাঁতার দেয়া। অথচ এখন পুকুরের অভাবে শিশুদের সুইমিংপুলে নিয়ে যেতে হয়। পুকুর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে সুউচ্চ দালানকোঠা। এই অবৈধ দখল বন্ধ করতে না পারলে ঢাকার ঐতিহ্য পুকুর ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরে বড় বড় ভবন গড়ে উঠছে। কিন্তু এগুলো নির্মাণের পেছনে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা নেই। ফলে পুকুর-খাল-বিল-জলাধার একের পর এক বিলীন হচ্ছে। যার ফলে একদিকে যেমন সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ পানিবদ্ধতা অপরদিকে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা নেভাতে মিলছে না পানির উৎস। জলাধার রক্ষায় আইন থাকলেও সেগুলো না মানায় একের পর এক ভরাট হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে আবাসন। সরকার জলাধার রক্ষায় ২০০০ সালে আলাদা আইন করলেও এর কোনো সুফল নেই। অথচ এ আইনে কোনো অবস্থায় খাল, বিল, নদী-নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতি এবং প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না। এমনকি সড়ক-মহাসড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণকালেও প্রাকৃতিক জলাশয়, জলাধার, খাল-নদী ইত্যাদির স্বাভাবিকতা নষ্ট করা যাবে না। আইনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে ও একান্ত প্রয়োজন হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু জলাধার আইনের তোয়াক্কা না করে জলাশয়গুলো দ্রুত দখল ও ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। নির্বিচারে জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুধু জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে না, কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল মতিন বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অগ্নিকাণ্ডে পানির উৎস সৃষ্টি বা রক্ষায় কোনো মাস্টারপ্ল্যান নেই। শুধু যেখানে পানি জমে বা অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিছুদিন গেলে আবার সে উদ্যোগেও ভাটা পরে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের গাফিলতিই এর জন্য মূলত দায়ী। বিভিন্ন পর্যায় থেকে জলাধার রক্ষায় বারবার তাগাদা দিলেও সেসবের কোনো বাস্তবায়ন হয় না অথবা করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে রাজধানীতে দুই হাজার পুকুর ছিল। শুধু পুকুর নয়, প্রায় ৪৪টি সে াতস্বিনী খাল ছিল। যে দুই হাজার পুকুর ছিল সেগুলোর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি কোথায় গেল, ৪৪টি খালের সিংহভাগ কেন হারিয়ে গেল? বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গোচরেই এসব খাল, পুকুর ও ঝিল দখল হয়েছে। যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলো সংরক্ষণ করা যেত, তবে রাজধানীবাসীকে আজ এই করুণ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
এক পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, খিলগাঁওয়ের পুকুর ভরাট করায় সেটি হয়েছে এখন খেলার মাঠ। এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর, জহুরুল হক হলের পুকুরটি টিকে আছে।

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.