সামাজিক অবক্ষয়: আমাদের নতুন প্রজন্ম

সামাজিক অবক্ষয়: আমাদের নতুন প্রজন্ম

বিজ্ঞজনের লেখায় পাই, ‘বর্তমান বিশ্বে প্রচার মাধ্যম পরমাণু বোমার চেয়েও শক্তিশালী। পরমাণু বোমা তো কেবল ধ্বংস করে, মানুষ মারে। কিন্তু প্রচার মাধ্যম সে তো মানুষ মারে না, মানুষকে দখল করে নেয়। সে যেমন চায়, মানুষকে তেমনিভাবে ভাবায়, হাঁটায়, বলায়, খাওয়ায়, স্বপ্ন দেখায়।’

২০১০ সালের এক সমীক্ষায় প্রকাশ, সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ ইংরেজ তার জীবনের ১২টি বছর টিভি দেখতে ব্যয় করেছেন। আমেরিকার একটি পরিবারে তাদের জীবদ্দশায় এক-চতুর্থাংশ সময় টিভির সামনে বসে কাটিয়েছেন। জাপানের ৯৫ শতাংশ পরিবার নিয়মিত টিভির দর্শক। ফ্রান্সে ৮৮ শতাংশ মানুষের অবসরের সিংহভাগ দখল করে রাখে টিভি।

খুব সম্ভব ১৯৮০ সালে পাবলিক অপিনিয়ন পোলের মাধ্যমে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য জনসমক্ষে এসেছিল। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। সেখানকার টিভি দর্শকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, আগের সপ্তাহে তাদের মধ্যে টিভি সিরিয়ালের বিজ্ঞাপিত পণ্য সামগ্রীর মধ্যে কোনগুলো তাদের মনে আছে। প্রায় অধিকাংশ দর্শকই মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার পণ্যবস্তুর নাম বলেছিলেন। কেউ কেউ অন্য কিছু। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তাদের স্মরণে থাকা পণ্যসামগ্রীর প্রথম দশটির তালিকায় একটিও নিজের দেশের বস্তুর নাম ছিল না। ভাবুন!

এছাড়াও আরো এক দিকও রয়েছে। জানাচ্ছেন বাংলাদেশের জনৈক নাট্যব্যক্তিত্ব-‘আমাদের সমাজে ছোটরা সোল্লাসে টেলিভিশনের অমর সিরিয়াল ও সুনির্বাচিত সিনেমায় বোধহয় প্রতি পনেরো মিনিটে ৫টি খুনের দৃশ্য দেখে। এছাড়া আরো কিছু হত্যার সঙ্গে থাকতে হয় তাদের। যেমন দৃষ্টি দিয়ে খুন, কথা দিয়ে খুন, উপেক্ষা দিয়ে খুন। আমাদের সমাজ জীবনে অপরিহার্য হয়ে ওঠা টেলিভিশনের কল্যাণে একটা তেরো বছরের ছেলে বা মেয়ে সে প্রায় প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষভাবে যৌন উত্তেজক যৌন আচরণকে উসকে দেওয়া নৃত্যগীত দেখছে এবং তারই সঙ্গতকারী সংলাপ শুনছে।

একজন পরিচালক লিখছেন ‘আপনি যখন মধ্যরাতের গভীরে স্ত্রীর সঙ্গে টিভির সামনে বসবেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ আনসেনসর্ড’ ছবি দেখার জন্য, তখন আপনার সন্তান নাগালের মধ্যেই নিদ্রাতুর থাকবে, পাশের ঘরে থাকবেন আপনার ভাই, বোন, বাবা-মা। শিশুদের ঘুম ভাঙবে শৈশবের অমলিন সারল্য, প্রলয়ঙ্করী এক অস্পষ্ট মালিন্যের অতি ধীর সংক্রমণে আসক্ত হতে থাকবে সংগোপনে। পাশের ঘরে ভাই-বোন। স্বভাবতই তাদের ঘুম আসবে না, অবদমিত আকাক্সক্ষায় অসুস্থ হবে তারা। আপনি কিভাবে পরের দিন, দিনের আলোয় পুরনো সেই সম্ভ্রম, সেই অপত্য স্নেহ নিয়ে তাকাবেন আপনার সহোদয়ের দিকে? নৈতিকতার তর্জনি কি অধিকারে তুলে ধরবেন তাদের দিকে।

অথচ অন্য ধারার সিনেমা আগে তৈরি হয়নি? এখনো হচ্ছে না? চিলির কথা বলি। এখানে যখন শ্রমিক বস্তিগুলো পরিণত হচ্ছিল বন্দি শিবিরে, সন্ত্রাসে ডুবে যাচ্ছিল গোটা দেশ, কোকাকোলা আর ডিসকো কালচারে পচে যাচ্ছিল সমগ্র জাতির রুচিবোধ, নিরস্ত্র চলচ্চিত্র শিল্পীরা তখন সশস্ত্র হয়ে উঠলেন। পুলিশ খুনে বাহিনীর প্রহরা টপকে পৌঁছে গেলেন শ্রমিক বস্তিতে। সেলুলয়েডের ফিতায় তারা বন্দি করলেন সীমাহীন শোকের বিস্ফোরণকে।

বলিভিয়ার তামার খনিগুলো ছিল আমেরিকার প্রভুদের দখলে। শ্রমিকেরা দীর্ঘ শোষণের পর রুখে দাঁড়ালেন। অমানুষিক পুলিশি অত্যাচার চলল। কাছের পাহাড়ের আড়াল থেকে ল্যাটিন আমেরিকান চলচ্চিত্র যোদ্ধা বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান হারমান ছবি তুলতে থাকেন। এক সময় পুলিশের মেশিন গানের নল ঘুরে আসে ক্যামেরার দিকে। হারমান বুঝতে পারেন বিপদটা। তবু নড়েন না। মেশিনগানের প্রথম বুলেটটি লেন্স ভেঙে তার কপালে লাগার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ধরা থাকে সে দৃশ্য। ক্যামেরায় চোখ রেখে একজন মানুষের দেহ অসংখ্য বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য ধরা পড়ে হারমানের পেছনে রাখা সহকর্মীর ক্যামেরায়।

২০০৮ সালের কথা। উনিশ বছরের সাহসী আফগান কন্যা অলকা সাদাত স্বল্প দৈর্ঘ্যরে তথ্যচিত্রের জন্য ‘শান্তি পুরস্কার’ পায়। দুটো তথ্যচিত্র তৈরি করেন সাদাত। ‘মে বি দে আর ফর ইউ অ্যান্ড মি’ নামে। প্রথমটি মূলত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সেসব মেয়ের খণ্ডচিত্র, যারা বেশিরভাগ বলি হয়েছেন গার্হস্থ্য হিংসার। ওরা সুবিচারের আশা করেন। আর তাই, তাদের গল্প শুনিয়েছেন অলকাকে। আর সেসব সেলুলয়েডে বন্দি করে পাঠিয়ে দিয়েছেন সারা বিশ্বে। দ্বিতীয় ছবিটির বিষয়বস্তু সেসব মেয়েকে নিয়ে যাদের স্বামী আফগান সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। সরকার থেকে তাদের ব্যারাকে রাখা হয়েছে। অলকা সেই ব্যারাক থেকে তুলে এনেছেন মহিলাদের জীবন যুদ্ধের কাহিনী। ব্যারাক বাহিনী কেউ কেউ মুখ খোলেননি। ভয়ে। কাকে ভয়? বলেছেন স্বামীর নিষেধ আছে নিজেদের কথা জানাবার। কিন্তু স্বামী কোথায়? তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই।

অলকার বড় বোন চব্বিশ বছরের রোয়া সাদাতও তৈরি করেছেন দু’ ঘণ্টার ‘থ্রি ডটস’ নামের কাহিনীচিত্র। নায়িকা এক স্বামীহীনা। তিনটি সন্তানের মা। ছ’বছরের দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করে তিনি বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হন একজন সেনানায়ককে বিয়ে করতে। কিন্তু বিয়ের পরপরই সেই সেনানায়কটি তাকে ইরানে আফিমের চোরাচালানকারী হিসেবে পাঠিয়ে দেয়। এক সময় তিনি গ্রেফতার হন। আফগান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘থ্রি ডটস’ সেরা পুরস্কারে ভূষিত হয়।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। হিংসা, বিশ্ব সংসারের কূটচালগুলোই তো উঠে আসছে সিনেমার পর্দায়। তা দেখা কি উচিত বাড়ির কনিষ্ঠ শিশুটির? না, শিশুদের উপযুক্ত ছবিও তৈরি হচ্ছে আমাদের এ দেশে? চলচ্চিত্রের সুস্থ, স্বাভাবিক, দায়বদ্ধ একটি প্রবল প্রবাহ আমাদের পাশেই বয়ে চলেছে। কিন্তু তার সংবাদ আমরা কেউই জানতে পারি না। জানতে দেয়া হয় না।
– লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস