সাধারণের সাধারণ কিছু প্রত্যাশা

সাধারণের সাধারণ কিছু প্রত্যাশাবাংলাদেশের কোনো নির্বাচন নিয়ে বিজয়ী এবং পরাজিত দল একই সঙ্গে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে কারো জানা আছে কিনা জানি না, আমার নেই। অদূর ভবিষ্যতে এ রকম কোনো ঘটনার অবতারণা হবে এমন প্রত্যাশাও এখন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ করে না। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই বিজয়ী দলের হাসিমুখ, পরাজিত দলের সূক্ষ্ণ কারচুপি, জনরায় ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ।

যদিও আমজনতা খুব ভালো করেই জানে, কার অভিযোগ সত্য, কারটা নয়! তবে নির্বাচন নিয়ে সাধারণের মধ্যে যতই আগ্রহ, উদ্দীপনা, চাঞ্চল্য থাকুক না কেন, দিনশেষে নিজের জীবন-জীবিকার বিষয়টি মাথায় রাখতেই হয়, সেই দায়টি নিতেই হয়। কিন্তু এদেশের সাধারণ মানুষ কী চায়, সেটি বিজয়ী বা পরাজিত দলের নেতারা জানলেও সেই মতো কতটা উদ্যোগ নেন? জনগণের চাওয়া কিন্তু খুব বেশি নয়। একটি স্থিতিশীল সময়কে সঙ্গে করে দেশ এগিয়ে যাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য হাতের নাগালে থাকুক, শিক্ষা, খাদ্য, আশ্রয়ের মতো মৌলিক অধিকার ভোগ নিষ্কণ্টক হোক-এইটুকুই তাদের প্রত্যাশা।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ছিল জনমনে। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও অনেকের মনে দ্বিধা ছিল, নির্বাচন আসলেই হবে কিনা। হলেও তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সুষ্ঠু হবে কিনা, সুষ্ঠু নির্বাচন হতে গিয়ে কত জনের যেন প্রাণ যায়, কত জন যেন অঙ্গ হারায়! ভোটগ্রহণের আগের রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি এবং চট্টগ্রামের পটিয়ায় ভোট কেন্দ্র দখল, নির্বাচনী সরঞ্জাম লুট এবং একাধিক প্রাণহানি এই শঙ্কাকে আরো বেগবান করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। জনমনের সব শঙ্কা, আতঙ্ক উড়িয়ে দিয়ে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে নির্বচানের আগে এবং পরের নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন। লক্ষণীয়, ক্ষমতায় থেকে যে দলটি নির্বাচন পরিচালনা করল নিহতের তালিকায় তাদেরই নেতা-কর্মীর সংখ্যা বেশি। এমনটি এর আগে দেখা যায়নি। অথচ বাংলাদেশের মানুষের কাছে নির্বাচন মানে আনন্দ, নির্বাচন মানে উৎসব! পাঁচ বছর পর পর তারা এই উৎসব পালনের সুযোগ পান।

কিন্তু নির্বাচনে কারো না কারো কপাল পোড়ে! এ যেন অমোঘ নিয়তি! এর নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। নির্বাচনের পরের দিন নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পারুল নামের এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যিনি চার সন্তানের মা। স্বামী সন্তান নিয়ে তিনি গুছিয়ে সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার কপালে সুখ সইল না। নির্বাচন তার জীবনে ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে উপস্থিত হলো। পারুলের বিষয়টি গণমাধ্যমে দু’ধরনের বক্তব্য নিয়ে এসেছে। কেউ বলছেন, ধানের শীষে ভোট প্রদানের কারণে তাকে এভাবে অপদস্থ করা হয়েছে। অন্যপক্ষ বলছে, নির্দেশদাতা রুহুল আমীনের সঙ্গে পারুলের পূর্ব শত্রুতার জের ধরে নির্বাচনী সময়কে বেছে নিয়ে এই অপকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। যাতে সব দোষ নির্বাচনের ওপর পড়ে, যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়! পারুলের স্বামীর বক্তব্যে অবশ্য শেষোক্ত মন্তব্যের কিছুটা প্রমাণ মেলে।

তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, ভোট দিয়ে ফেরার পথে রুহুল আমীন পথিমধ্যে তার স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করছিল। তার স্ত্রী এক সময় এর প্রতিবাদ করে এবং তখন দু’জনের মধ্যে প্রচণ্ড তর্ক-বিতর্ক হয়। এরই জের ধরে ঘটনার রাতে রুহুল আমীন দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হামলা করে এবং তাকে ও তার সন্তানদের বেঁধে পারুলকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। তিনি কিন্তু একবারও বলেননি, কোনো বিশেষ মার্কায় ভোট দেয়ায় ঘটনাটি ঘটেছে। তারচেয়েও বড় কথা, পারুল ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এটা রুহুল বা তার গং জানবে কী করে? পারুল নিশ্চয়ই ভোট কেন্দ্র থেকে বেরিয়েই জনে জনে এটা বলতে শুরু করেনি! কেউ জিজ্ঞেস করলেও সাধারণত কেউ বলে না। কে কাকে ভোট দেবে এটা সম্পূর্ণই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং অধিকার। এতে কারো ওপর হামলে পড়ার কোনো ব্যাপার ঘটতে পারে না।

২০০১-এ নৌকায় ভোট প্রদানের অপরাধে সিরাজগঞ্জে পূর্ণিমা নামের এক কিশোরীকে বিরোধীপক্ষ ভয়াবহ পাশবিক নির্যাতন করেছিল। নৌকায় কিংবা ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপরাধে বারবার নারীর ওপর এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা কেন ঘটে, যারা ঘটায় তাদের মস্তিষ্ক কোন উপাদানে তৈরি, তাদের মানসিকতা কিভাবে এ ধরনের অপরাধ সংঘটনে সায় দেয়, এরপর এইসব পুরুষরা মানুষ হিসেবে সমাজে মুখ দেখায়, যারা দেখে তারা কিভাবে এদের মেনে নেয় তা আমার বোধগম্য হয় না।

এর চেয়েও বেশি বিস্ময়ে, বেদনায় হতবাক হয়ে যাই যখন দেখি একদল লোক লাইট, ক্যামেরা ও সাংবাদিকসমেত হাজির হয়ে অপদস্থ এই নারীর প্রতি সমবেদনা জানাতে উপস্থিত হন। আমি জানি না মেয়েটি তখন এদের উপস্থিতিতে কতটা ভরসা পান, কতটা কষ্ট তার লাঘব হয়! তার কান্না, অসহায়ত্ব কোথায়, কীভাবে সে লুকায় তখন! এত উৎসুক দৃষ্টির সামনে কিভাবে সে নিঃশ্বাস নেয়!

স্বস্তির কথা- ২০০১-এ তৎকালীন সরকার পূর্ণিমার কোনো দায় স্বীকার করেনি, কাউকে তাদের দোষী মনে হয়নি। তাই কেউ গ্রেফতার হয়নি, বিচারও না। এবার মামলা হয়েছে, দোষীদের অধিকাংশ ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। আদালত তাদের প্রত্যেকের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। পূর্ণিমা কিংবা পারুল বলে নয়, নারী হেনস্থার সঙ্গে প্রত্যেক অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক- এটাই সবাই প্রত্যশা করে।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ পুরো মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছেন। নতুন বছরে নতুন সরকারের অধীনে শুরু হয়েছে আমাদের পথচলা। মন্ত্রিসভা গঠনে জনগণ চমকিত হলেও তারা অপেক্ষা করে আছেন মন্ত্রণালয় চালাতে কে কতটা কৌশলী এবং দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন তা প্রত্যক্ষ করতে। আওয়ামী লীগ বারবারই তারুণ্যের শক্তিকে দেশ ও জাতির অগ্রগতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিবেচনায় রেখেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদান এবং মন্ত্রিসভা গঠনে তারা তারুণ্যকে যথাযথ মূল্যায়নও করেছে। সরকার সফল হোক এটা সাধারণ মানুষ কামনা করে।

কারণ সরকার সফল হলে দেশ ও জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘোরে। জনপ্রত্যাশা পূরণের সুযোগ বিস্তৃত হয়! সাধারণ জনগণের চাহিদাগুলো আকাশচুম্বী নয়। স্থিতিশীল একটি পরিবেশে তারা তিনবেলা পেটপুরে ভোজালমুক্ত খাবার খেতে চান, রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে চান, সড়কে নিরাপদে চলাচল করতে চান। আর চান দেশটি দুর্নীতিমুক্ত হোক, অপরাধীর বিচার হোক সে যে দল বা গোত্রের হোক না কেন! এই চাওয়াগুলো অনেক বেশি চাওয়া নয়। সরকার আন্তরিক এবং উদ্যোগী হলেই এগুলো পূরণ করা সম্ভব। – লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.