সাত মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশ বিক্রি

আমানতে সুদের হার বাড়িয়েও সংকট মেটাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। তুলনামূলক সুদের হার কম হওয়ায় এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকে নানা ধরনের জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাই অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ব্যাংকবিমুখ হয়ে সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন। ফলে অর্থবছরের সাত মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এ সময়ে নিট বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের পুরো সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমাবে না সরকার। উল্টো সঞ্চয়কারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সারাদেশের সঞ্চয়পত্রের অফিসগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। যাতে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্র ক্রয়, নগদায়ন এবং মুনাফা তোলার জন্য অফিসে যেয়ে, ঘরে বসেই অনলাইনে করা যায়।

সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে পাঁচ হাজার ১৪০ কোটি টাকা নিট ঋণ এসেছে সরকারের কাছে। যা একক মাস হিসেবে চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ নিট ঋণ। এর আগে সর্বোচ্চ নিট ঋণ হয়েছিল অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ে। ওই মাসে পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে নিট ঋণ হয়েছিল দুই হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। নভেম্বরে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা, অক্টোবরে চার হাজার ৬২০ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে তিন হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, আগস্টে তিন হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা এবং অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পাঁচ হাজার ৫৩ কোটি টাকা নিট ঋণ হয়েছিল সরকারের।

প্রসঙ্গত, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিনিয়োগ। তাই বিনিয়োগের ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতিমাসে মুনাফা দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

এদিকে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তার ৯৬ শতাংশ সাত মাসেই নিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে সরকারের ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা এক সময় সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মূলত স্বল্প এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় অনেক সামর্থবান মানুষও এ খাতে বিনিয়োগ করছেন। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে মিসইউজ হচ্ছে কিনা অর্থাৎ সামর্থ্যবান মানুষরাও এ খাতে বিনিয়োগ করছেন কিনা সেটা সরকারকে কঠোর অবস্থানে নজরদারি করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সুদের হার বেশি হওয়ায় এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকায় বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছেন গ্রাহকরা। আর এক্ষেত্রে সাধারণত স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই এ খাতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকেন। এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেশি হলে সুদ পরিশোধের দায়ও বেশি হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার তো জনগণের করের টাকা থেকেই এই সুদ পরিশোধ করবে, যেটা কিনা জনগণের কল্যানেই ব্যয় হবে। তবে এ খাতে অপব্যবহার হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া ঋণ সরকারকে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে।

একই বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ক্রমাগত কমতে থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন?্য সঞ্চয়পত্র ছাড়া আর কোনো লাভজনক বিকল্প পাচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা। এতে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাজেট ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল ঋণের চাপে সরকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, তা এড়ানোর পথ ‘একটাই’। সেটা হচ্ছে সুদের হার কমানো। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ‘পেনশন’ এবং মহিলাদের জন্য ‘পরিবার’ সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

এদিকে, দায় বেশি হলেও এ খাত থেকেই বেশি ঋণ নিতে চায় সরকার। তাই ব্যাংক থেকে যে অর্থ ঋণ নিচ্ছে, তার চেয়ে পরিশোধ করছে বেশি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলোর দেনা বাবদ ১৩ হাজার ৭৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে নিট বিনিয়োগ ছিল ২৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। যা ওই অর্থবছরের জন্য এ খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার নির্ধারিত ঋণের লক্ষ্যমাত্রার ১১৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। ওই অর্থবছরে সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সাত মাসে সঞ্চয় স্কিমগুলোর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে পরিবার সঞ্চয়পত্র থেকে। এখানে গত সাত মাসের নিট ঋণ ১০ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, নিট ঋণ সাত হাজার ৮১২ কোটি টাকা। পেনশন সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে দুই হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে দুই হাজার ৭৭ কোটি টাকা।

মানবকণ্ঠ/এসএস