সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ উন্নয়নের দাবিদার হলেও সুশাসনে ব্যর্থ

ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ উন্নয়নের সাফল্যের দাবিদার হলেও সুশাসনে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিচার বিভাগবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। সম্প্রতি মানবকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি বলেন, আইনের শাসনের ব্যর্থতা সর্বোপরি গণতন্ত্র ব্যত্যয়ের দায়ভারও নিতে হবে আওয়ামী লীগকে। ৫ জানুয়ারির একতরফা ভোটের জন্য আওয়ামী লীগ একা দায়ী নয় উল্লেখ করে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, তবে ম্যান্ডেট ঘাটতি পূরণে চেষ্টার অভাব এবং বিরোধীদলকে স্পেস না দেয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না। সর্বোপরি দেশে কার্যকর নির্বাচনী প্রতিনিধির শাসন বিদ্যমান নাই। তবে জনগণকে ধৈর্যধারণ পূর্বক ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের বন্ধ দরজা খোলার দিকে হাঁটতে হবে। কোনো ধরনের জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না। দেশে গণতন্ত্রের সংকট আছে বলে জানিয়ে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতময় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছে, নির্বাচনমুখী রাজনীতির সূচনা ঘটছে।
এক প্রশ্নের জবাবে জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বলেন, দেশে মোটা দাগের সিন্ডিকেট অপরাধ বা চাঁদাবাজির অভিযোগ কমেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার জনমত নির্ভর না হয়ে অতিমাত্রায় কর্মিনির্ভর হয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ দল কর্মী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ফলে সরকারি দল কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও সুশাসনের অভাব ও কর্মী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। কার্যকর প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থা না থাকায় এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। তিনি বলেন, একই সঙ্গে সরকার দলীয় কর্মী নিয়ন্ত্রণ ও কর্মীদের মধ্যে জনবান্ধব কার্যক্রম বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। অনুদার গণতন্ত্র থেকে উদার গণতন্ত্রে যথাসম্ভব দ্রুত প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
বাংলাদেশে বিদেশি দেশগুলোর হস্তক্ষেপ কাম্য নয় জানিয়ে জাপা নেতা বলেন, উল্লেখযোগ্য দেশগুলো বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে উদার মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত করেছে। আমাদের অর্থনীতি প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদেশি সুপার পাওয়ারগুলোকে উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ভারসাম্যনীতি এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব নীতি অবলম্বন করা উচিত।
জঙ্গি দমনে সরকার কতটুকু সফল হয়েছেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জঙ্গি দমনে বেশ কার্যকর ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, সুফীবাদ ও বৌদ্ধ ধর্মের আদি প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের মানুষ উগ্রবাদ পরিহার করে। তবে মাঠ পর্যায়ে সুশাসনের অভাব অথবা বহুত্ববাদের চর্চার সুযোগ না থাকলে জঙ্গিবাদের উত্থান বাড়তে পারে অথবা জঙ্গিবাদ কিছুটা জনসমর্থন পেতে পারে।
বর্তমান সময়ে জাতীয় পার্টি উদার রাজনীতির চর্চা করে আসছে দাবি করে জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বলেন, পার্টির চেয়ারম্যানের একটি অত্যন্ত উন্নয়নবান্ধব, জনবান্ধব ইমেজ আছে যা পার্টির জনসমর্থন বৃদ্ধিতে সহায়ক। একসঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনুদার এবং আগ্রাসী রাজনীতি করায় শান্তিপ্রিয় মানুষ জাতীয় পার্টিকে বেছে নেয়া শুরু করেছে বলে তিনি দাবি করেন। সংসদে ও সংসদের বাইরে থাকার কারণে জাপা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে মন্তব্য করে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জাপার সামনে কিছু জনবান্ধব ও সুশাসন বান্ধব এজেন্ডা আছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে জাপা উপজেলা পরিষদ করেছিল যা সব মহলে প্রশংসিত।
বর্তমানে জাপা জনগণের নিরাপত্তা, সুশাসন এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন মুখ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং জনগণ তা গ্রহণ করছে বলে জানান।
রাষ্ট্রপতির সংলাপের উদ্যোগকে একটি মাইলফলক উল্লেখ করে শামীম হায়দার বলেন, রাজনীতির শ্বাস নিঃসরণ সংকটে মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগটি একটি স্বস্তির সৃষ্টি করেছে। এর ফলে সমাজে বা রাষ্ট্রে যে অবিচার চলছিল তার সাময়িক অবসান হলো। সার্চ কমিটিও সব মহলের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
তারা যা দেখিয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি আশার সঞ্চার করেছে গোটা জাতিকে। আমরা একটি টানেলের ভেতরে আলো পেয়েছি। সব বিরোধী দলকে স্বীয় রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে হবে। ধাপে ধাপে আগামী জাতীয় নিবার্চনটি যেন প্রতিদ্বন্দিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় সেদিকে ধাবিত হতে হবে। উদার গঠনমূলক রাজনীতির মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।