সাঈদীর মামলা: নেপথ্য কথা

যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় উচ্চ আদালতে ফাঁসির আদেশ বহাল না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আশাহত হয়েছে এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বহুদিন ধরে যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করার কারণে আমি নিজেও কষ্ট পেয়েছি বৈকি। কিন্তু গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে এই বিচারের ব্যর্থতার দায় যখন প্রসিকিউশনের ওপর আরোপ করা হয় তখন বিস্মিত না হয়ে পারি না। আরও বেশি স্তম্ভিত হই বেশ কয়েকটি সূত্রে যখন দেখি মানুষ অভিযোগ করছে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাতে ফাঁসি না হওয়ার অন্যতম কারণ প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজের ব্যর্থতা। আমার আজকের এই লেখার সূত্রপাত ঠিক এখানেই।

আমি তুরিন আফরোজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদান করি ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখে। সুতরাং এই তারিখের আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো যুদ্ধাপরাধ মামলার শুনানির জন্য আমাকে দায়ী করা কি করে সম্ভব? আর যদি করতেই হয়, তবে তা প্রকৃত তথ্য-নির্ভর কিনা সেটা যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আসুন যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঠিক কবে শুরু হলো আর কবে শেষ হলো সেটা বিশ্লেষণ করে আসি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি অফিসিয়াল ওয়েব সাইট রয়েছে। অফিসিয়াল ওয়েব সাইটটির ঠিকানাটি হোল <www.ict-bd.org>। এই ওয়েব পেজে গেলে দুটি ট্রাইব্যুনালে এই পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোর তালিকা ও একই সঙ্গে ওইসব মামলার সম্পূর্ণ রায় খুঁজে পাওয়া যায়। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটির রায় খুঁজে পেতে গেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ক্লিক করে ‘Judgments & Orders’- এ যেতে হবে। এর তালিকার ২২নং মামলাটিতেই যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সম্পূর্ণ রায়টি খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, নতুন মামলা আসলে তালিকা নম্বরটি পরিবর্তন হয়। তবে খুঁজে পেতে সব চাইতে সহজ উপায় হলো যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রথম মামলা। সেই অনুযায়ী দেখলেই মামলার রায়টি পাওয়া যাবে।

যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়টির প্রথম পৃষ্ঠাতেই উল্লেখ করা আছে যে, ওই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোন্ কোন্ প্রসিকিউটরের সহায়তায় সম্পন্ন করা হয়েছে। ওখানে মোট দশ জন প্রসিকিউটরের নাম রয়েছে। তুরিন আফরোজ নামটি কিন্তু সেখানে নেই। আর থাকবেই বা কেন? যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার তদন্ত ও শুনানি কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালের ২০ জুলাই তারিখে (যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়, পৃষ্ঠা ২১, অনুচ্ছেদ ৩৩)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির শুনানি শেষ হয় ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে। এর বহু পরে অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার শুনানি শেষ হওয়ার প্রায় আড়াই মাস পরে আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদান করি। তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার শুনানির দায়ভার ঠিক কি করে আমার ওপর বর্তায়? আমি তো যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা চলাকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তই হই নাই।

এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষিত হয় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে আমি কাজে যোগ দানের মাত্র ৮ দিন পরে। কিন্তু এই ৮ দিনের মধ্যে যখন নাকি মাননীয় ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় চূড়ান্ত করছিলেন তখন আমার মতো একজন ব্যক্তি-প্রসিকিউটর কি তাদের সঙ্গে তাদের চেম্বার-কক্ষে গিয়ে রায় নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার রাখি? নাকি আমাদের গোটা প্রসিকিউশন টিম সেটা করতে পারত? তাহলে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় বিপর্যয়ের কারণ প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ কি করে হলো বোধগম্য হচ্ছে না।

এবার আসি দ্বিতীয় প্রসঙ্গে। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অপরাধের দণ্ড ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন করা হয়েছে কিন্তু সেটা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নয়, বরং তা করা হয়েছে উচ্চ আদালতের আপিলে। এখন কথা হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম যুদ্ধাপরাধী মামলার শুধুমাত্র ট্রায়াল পর্যায়টিতে অংশগ্রহণ করেন। তারা কেউই আজ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধাপরাধী মামলার আপিল শুনানিতে অংশগ্রহণ করেননি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম আর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধী মামলার আপিল শুনানি পরিচালনা করেন বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস। আজ পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে তিন বিচারক যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় দিয়েছেন তারা তিনজন-ই কিন্তু সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সমতুল্য বিচারক।

এখন তাহলে মূল প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কি দণ্ড নিরূপিত হয়েছিল? অবশ্যই ফাঁসি এবং এই রায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সমতুল্য তিনজন বিজ্ঞ বিচারক প্রদান করেছেন। তাহলে নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সেই ১০ জন প্রসিকিউটররা যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার শুনানিতে সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অপরাধ প্রমাণ করতে এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাহলে প্রসিকিউশনের ব্যর্থতার প্রশ্ন আসছে কেন? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম তো তাদের সুনির্দিষ্ট দ্বায়িত্ব পালনে শতভাগ সফলতা দেখিয়েছে। এখন যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলে কেন তার ‘মৃত্যুদণ্ড’ টিকেনি সেটা অন্য বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এর বিশ্লেষণ নিশ্চয়ই আপিল শুনানিতে অংশগ্রহণকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আমার বা আমাদের চাইতে বেশি ভালোভাবে করতে পারবে। আমরা সব কিছুরই নির্মোহ বিশ্লেষণের আশা রাখি। কিন্তু কোনো কিছু না জেনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম বা একজন ব্যক্তি-প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কি যুক্তি সংঙ্গত?

সবশেষে বলতে চাই, যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা নিয়ে চক্রান্ত বহু হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী উধাও, স্কাইপি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি, ইত্যাদি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের অকারণ অযাচিত, নেতিবাচক প্রচারণা। আমাদের সবই মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ঘরের ভেতরের শত্রুকেও দমণ করতে হয়েছে আমাদের। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার তদন্তকালে যখন মামলার জোগাড়কৃত সকল গোপনীয় দলিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে কর্পূরের মতো উধাও হয়ে যায় তখন আমরা নিজেরাও কি ভীত হইনি? সাঈদীর এক অতি কাছের আত্মীয় যখন তদন্ত সংস্থায় সাঈদীর মামলার তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয় আর এই কাজটি করে, তখন আসলে প্রশ্নটা অনেক বড় এবং ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায় বৈকি। আতঙ্কে বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু তারপরও কি সেই বিতর্কিত নিয়োগের দায়িত্ব আজ পর্যন্ত কেউ নিয়েছে? কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত কি আজ পর্যন্ত হয়েছে? আমরা ন্যায়ের পক্ষে গণ-আওয়াজ তুলতে ভালোবাসি, ছুতো পেলেই অন্যকে অভিযুক্ত করতে অসাধারণভাবে পারদর্শী হয়ে উঠি, কিন্তু প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এত দীর্ঘসূত্রিতা কেন করি? আমরা কি সত্যকে মোকাবিলা করতে ভয় পাই? নাকি মিথ্যার বেসাতিতে আত্মতৃপ্তির বিলাসিতায় নতুন ভোরের অলীক স্বপ্ন দেখি?
– লেখক : আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.