সাইন বোর্ডেই সীমাবদ্ধ ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প!

সাইন বোর্ডেই সীমাবদ্ধ ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প!

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে উত্তরা হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মাণ কাজ। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, জটিলতা কাটিয়ে শিগগিরই আবারো শুরু হবে প্রকল্পের কাজ। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ভাঙতে হতে পারে এই ইউলুপগুলো। শেষ পর্যন্ত শুধুই অর্থের অপচয় হতে পারে বলে দাবি তাদের।

জানা গেছে, লেন বদল করতে রাস্তাতেই গাড়ি ঘোরানোর জন্য ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় উত্তর সিটি কর্পোরেশন। ২০১৫ সালে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের জুনে। দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। দফায় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পরও জমি সংক্রান্ত জটিলতায় এ প্রকল্পের কাজ আটকে আছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে জটিলতা না থাকলেও তেজগাঁও নাবিস্কো ও সাতরাস্তায় কাজে হাতই দেয়া হয়নি। অর্থাৎ দুই মেয়াদে সাইন বোর্ডেই আটকে আছে প্রকল্প।

ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম এ সম্পর্কে বলেন, তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্নের মধ্যে ছয়টির ভূমি ব্যবহারের অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা ছিল ঢাকা সড়ক ও জনপদ বিভাগের সঙ্গে। প্রকল্পের শুরুতে জমি দিতে আপত্তি না করলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আপত্তির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘœ ঘটেছে। যা সম্প্রতি মিটেছে পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণে। যদিও প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সাহেব থাকতে উনারা আমাদের বলেছিলেন তাদের জমি আমরা ব্যবহার করতে পারব। আমরা ইউটার্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সব প্রক্রিয়া শেষ করেছি।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই উত্তরায় তিনটি ইউটার্ন নির্মাণ শুরু হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে আশা করছি, বাকি ইউটার্নগুলোর নির্মাণ কাজ আমরা শেষ করতে পারব। এটা ছোট প্রকল্প হলেও ঢাকার ট্রাফিক সিস্টেমের ওপর এটা তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করবে।

জানা যায়, দুই বছর আগে এ প্রকল্পের ব্যয় ২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ধরা হয়। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেবে সরকার। বাকি চার কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেবে ডিএনসিসি। তেজগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ‘ইউটার্ন’ নির্মাণের এই উদ্যোগ নেন উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পর চলতি বছরের জুনের মধ্যে দৃশ্যমান হওয়ার কথা এসব ইউলুপের। কিন্তু এ প্রকল্পে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় তা আটকে যায়। সিটি কর্পোরেশনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ডিএনসিসির দরকার ২৩ একর জমি। এ ২৩ একর জমির মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ১ দশমিক ৩৬ একর, বাংলাদেশ রেলওয়ের দশমিক ২২ একর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের দশমিক শূন্য নয় একর এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দশমিক শূন্য ছয় একর জমি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে।

এদিকে টানা হ্যাচড়ার মধ্যে ইউলুপের নির্মাণ কাজ এখন যেন সাইন বোর্ড সর্বস্ব। একে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এরই মধ্যে দফায় দফায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বেড়েছে।

জানা যায়, ইউলুপের নির্মাণ প্রকল্পের ধারণা ২০১৫ সালে প্রথম দেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গ্র্যাজুয়েট কামরুল ইসলাম। তখন তিনি দাবি করেন, তার এ ধারণা বাস্তবায়ন করা হলে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ যানজট কমবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, যতটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ‘ইউটার্ন’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যানজট নিরসনে তা অতটা কার্যকর নাও হতে পারে। তিনি বলেন, প্রায় ২৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভাঙতে হবে নিশ্চিত জেনেও এই প্রকল্প এগিয়ে নেয়া হবে শুধুই অর্থের অপচয়।

কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহবুব আলম বলেন, ভবিষ্যতে ভাঙলেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইউটার্ন প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে।

সূত্র মতে, ঢাকার মানুষকে যানজট নামের ‘যন্ত্রণা’ থেকে মুক্তি দিতে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত সড়কের ডিএনসিসি পরিকল্পিত সম্ভাব্য ১১টি ইউলুপ হচ্ছে সাতরাস্তা, মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনালের নিচে, চেয়ারম্যান বাড়ি, কাকলী, বনানী আর্মি গলফ ক্লাব, উত্তরা ও খিলক্ষেতের মাঝামাঝি কাওলা, র‌্যাব-১ অফিসের সামনে, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের জসিমউদ্দীন রোড ও আবদুল্লাহপুরে নির্মাণ করা হবে। এগুলো দুই ধরনের হবে। টাইপ ‘এ’ ও ‘বি’। টাইপ ‘এ’ ইউলুপগুলো হবে ১৪৪ ফুট প্রশস্ত। এটি নকশা করা হয়েছে বাস এবং অন্যান্য বড় যানবাহনের জন্য। এ ছাড়া টাইপ ‘বি’ ইউলুপ হবে ১০৪ ফুট প্রশস্ত। এগুলো নকশা করা হয়েছে ছোট গাড়ির জন্য। দুটি ইউলুপের মধ্যে দূরত্ব হবে শূন্য দশমিক ৮ কিলোমিটার থেকে ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ আনোয়ার বলেন, ইতিমধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ইউলুপ নির্মাণের লক্ষ্যে আমরা দুটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে পাঠিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে একটি বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে আমার জানা নেই।

মানবকণ্ঠ/এসএস