সাংবিধানিকভাবে সরকার বহাল রেখেই জাতীয় নির্বাচন

সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে মন্ত্রিপরিষদ ছোট আকারে করতে পারেন। সেটা নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। নির্বাচনকালীন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনকালীন সরকার (বর্তমান সরকার বাদ দিয়ে অন্য কোনো সরকার) বলে সংবিধানে কোনো সরকারব্যবস্থার কথা উল্লেখ নেই বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান সরকার বহাল রেখেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে সংবিধানে বলা আছে।

সংবিধানের ৫৭ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না।’

সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাওয়ার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন করিতে হইবে।’

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। সে হিসাবে সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারি। এর ৯০ দিন আগে অর্থাৎ ২৯ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব প্রস্তুতি- সরকার গঠন, তফসিল ঘোষণা, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র আহ্বান, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার বলতে কিছু নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদটি বাতিলও করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আইনজ্ঞরা।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে সংসদ বহাল রেখে সরকারের রুটিন ওয়ার্ক পরিচালনা এবং নির্বাচন কমিশনকে অবাধ নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করা।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনকালীন সময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে মন্ত্রিপরিষদ ছোট আকারে করতে পারেন। সেটা নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন কথাটা ঠিক নয়।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন মানবকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে কিছু বলা নেই। তবে এই নির্বাচনটা যেহেতু দেশের সব নাগরিকের জন্য, দেশ পরিচালনার জন্য, নির্বাচন কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের বসা উচিত। আগামী নির্বাচনের সময় কে বা কারা সরকার পরিচালনা করবে, এমন সিদ্ধান্তের জন্য সংলাপ জরুরি, সব দলের সঙ্গে বসা জরুরি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

জয়নুল আবেদীন বলেন, বিগত সময়ে নির্বাচন পরিচালনার আগে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচনের আগে এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেত মজুমদার মানবকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার হবে খুবই ছোট পরিসরের। এটি হবে এমপিদের মধ্য থেকে। অল্প সময়ের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের মেয়াদ থাকবে। এটি সংবিধানে আছে। তবে সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে সেটি স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

বাসেত মজুমদার বলেন, সাংবিধানিকভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে ছোট আকারে সরকার গঠন করে নির্বাচন দিতে পারেন এবং বর্তমান সরকার বহাল রাখতেও পারেন। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ছাড়া কোনো নির্বাচন করা যাবে না সংবিধানে উল্লেখ আছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারুক হোসেন বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছু নেই। এ সরকারের বিষয়ে সংবিধানে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকার বলে সংবিধানে কোনো সরকারব্যবস্থার কথাও বলা নেই।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ