সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি উপেক্ষিত

3মীর আব্দুল আলীম
সারাদেশে একের পর এক হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে এবং সাংবাদিকরাও এ থেকে বাদ যাচ্ছেন না। স্বাধীন মত প্রকাশ করতে গিয়ে যদি একের পর এক সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটে কিংবা সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন তাহলে এর চেয়ে হতাশাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পৌর মেয়রের গুলিতে নিহত হন দৈনিক সমকালের সাংবাদিক আ. হাকিম শিমুল আর তার মৃত্যুর খবর শুনে শোকাহত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন নানি রোকেয়া বেগম। এমন ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ শঙ্কিত না হয়ে পারে না। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতরা যারই পৃষ্ঠপোষকতা পাক না কেন তাদের কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। সরকার ও প্রশাসন এ ব্যাপারে সজাগ এবং ইতোমধ্যে মূল হোতাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে আশার কথা হলো এটিই।
প্রশ্ন হলো সাংবাদিকদের ওপর কেন একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে? কোনো সরকারের আমলেই প্রণীত হয়নি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন। এমনকি দেশে অব্যাহত সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটলেও কোনো খুনের বিচার প্রক্রিয়াও সুষ্ঠুভাবে এগোয়নি। প্রকাশ্যই সিরাজগঞ্জে মেয়রের গুলিতে সাংবাদিক হাকিম খুন হন। রাজধানীসহ সারাদেশের সাংবাদিকরা প্রতিবাদী হওয়ায় পরে পুলিশ মেয়র হালিমুল হক মিরুকে ধরতে অভিযান চালায় এবং সফল হয়। দেশে সাংবাদিক হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃষ্টান্ত বিরল। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দিনের পর দিন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে সাংবাদিকতা পেশা ক্রমাগতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথাগত দুঃখপ্রকাশ ও হামলাকারীদের শাস্তির আশ্বাস দিলেও আখেরে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না এবং সুফলও মেলে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। গত দেড় যুগে ৫১ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই দেশটিতে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ঘটনা থেকে শুরু করে অনেক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঠিক বিচার হয়নি। খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকরা নিজেরাই খবর হচ্ছেন। প্রতি বছরই একাধিক সাংবাদিকের অপঘাতে মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু সারাজীবন সত্যের পেছনে ছুটে বেড়ানো এসব সাংবাদিকের হত্যারহস্য হিমশীতল বরফের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। শুধু বিচারই নয়, কোনো একটি হত্যাকাণ্ডেরও রহস্যই উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাপন করছে স্বাভাবিক জীবন। কেউ কেউ রয়েছে জামিনে। অনেক হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য, তদন্তকাজ ঝুলে আছে। কয়েকটি মামলার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এ দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিক হত্যারও বিচার না হওয়া অমার্জনীয় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায় কোনো সরকারই এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব অথচ আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক কোনো সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে অহরহ। সরকারকে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারে অবশ্যই আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে।
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে-সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের অনেক মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, প্রতারক, ব্লাকমেইলার ও ভীতিকর কোনো প্রাণী এমন ধারণাই পোষণ করেন দেশের একাংশ মানুষ। সাংবাদিকরা এর কোনোটাই নন। সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এটা কেবল পেশা নয়, একজন সাংবাদিক এ পেশায় থেকে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের কতিপয় অসৎ সাংবাদিক অর্থের বিনিময়ে সারাদেশে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে এটা অসত্য নয় তবে এই সংখ্যা নগণ্য। এরা সাংবাদিক নন। সাংবাদিক সমাজের কলঙ্ক। এদের কতকের কারণে সাংবাদিকতা যে একটি অনন্য পেশা তা দেশের অনেক মানুষ জানে না। সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাংবাদিকরা জাতির বিবেক বলে বিবেচিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্বসহকারে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অনিয়ম-অসঙ্গতি তুলে আনেন তারা। বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার সঙ্গে খবর পৌঁছে দেন সাধারণ মানুষের কাছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের কারণে মুহূর্তের মধ্যে সংবাদ চলে আসে জনসাধারণের দোরগোড়ায় আর এসব সংবাদ পৌঁছে দিতে প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা তাদের সর্বোচ্চ মেধা, শ্রম, দায়িত্ব ও আন্তরিক সেবা বিনিয়োগ করেন। এসব তথ্য ও অসঙ্গতি তুলে ধরে যেমন দেশের নাগরিকদের তাদের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলেন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদেরও বাধ্য করেন সঠিক পথ অনুসরণ করে মূল কাজটি করতে। এর ফলে অনেক সাংবাদিকই হয়ে ওঠেন অশুভচক্রের চক্ষুশূল। এই অন্ধকার দূর করতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এসএস