সাংবাদিকতার সেকাল-একাল

সালেহ চৌধুরী:
১৯৬৩-এর শেষ দিকে সাংবাদিকতায় যোগ দিয়ে ’৯৭-এর শেষদিক পর্যন্ত এ পেশাতেই নিয়োজিত ছিলাম। চৌত্রিশ বছরের এই পেশার পরিচয় বহন করেই বেঁচে আছি। এ পরিচয় বদলাব যে মনে করি না। কেননা আমি আর কোনো পেশার দিকে পা বাড়াইনি। সঙ্গতভাবেই সংবাদপত্র আমার জীবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। নিত্যদিন সকালে পত্রিকা পড়েই শুরু হয় কাজ-অকাজ, হ্যাঁ, পত্রিকা বলতে যা হাতের কাছে পাই খুঁটিয়ে দেখাই আমার অভ্যাস।
সময়ে সব কিছুই বদলায়। এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যাশিতও বটে। কেননা স্থবিরতা তো বলতে গেলে মৃত্যুরই নামান্তর। আমাদের সময়ের সঙ্গে তুলনায় করলে পত্রিকার অবয়বেও আকাশ পাতাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। মাঝেমধ্যেই এ নিয়ে ভাবি। মনে এতে পুলকেরও সাড়া পাই। আজকের খবরের কাগজ, চেহারায় অন্তত প্রথম দেখাতেই মন খুশি করে দেয়ার মতো।
এর প্রধান কারণ হচ্ছে প্রযুক্তিগত উন্নতি। সেকালের প্রকাশনার জন্য যা ছিল কল্পনারও বাইরে। সিসের হরফে কম্পোজ করে ফ্ল্যাটবেড মেশিনে ছেপে ছয় কিংবা আট পৃষ্ঠার একটা কাগজ ছেপে বের করতে রাত কাবার হয়ে যেত। হ্যাঁ, দৈনিক পত্রিকা তখন ছয় বা আট পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভাঙা টাইপে কম্পোজ করে ছাপাখানা থেকে যা বের হতো তার পাঠোদ্বারও অনেক সময় দুষ্কর হয়ে দাঁড়াত। ব্লক বানিয়ে ছাপা কালি লেপটানো ছবিতে কি আছে, অনেক সময় ক্যাপশনের সাহায্য ছাড়া বোঝাই যেত না!
শিক্ষার হার পরিবর্তন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠকের আগ্রহের কমতি ছিল বলা যাবে না। ঢাকার কাগজ অধিকাংশ জেলা শহরেই পৌঁছাতো প্রকাশের একদিন পর। দূর মফস্বলের কথা সহজেই অনুমেয়। এর মাঝেও দেখতাম কাগজটা হাতে পেলে পাঠকরা কি আগ্রহ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েন তার ওপর। আজকের দিনে খবরের জন্য পত্রিকার ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে গেছে। কোথায় কি ঘটছে, তা পৃথিবীর যে দূর প্রান্তেই হোক, টেলিভিশনের বদৌলতে কেবল জানাই নয়, দেখাও হয়ে যায়, বলতে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই। এর পরও পত্রিকার আকর্ষণ কিন্তু হ্রাস পায়নি। পাওয়ার কারণও নেই। এক ঝলক দেখা বরং ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগ্রহই উসকে দেয়। বহুবর্ণে ছাপা ছবি নিয়ে ঝকঝকে পত্রিকাটি সামনে নিয়ে বসার তাগিদ বাড়ে। আজকে দিনে কাগজের প্রচার সংখ্যার বৃদ্ধিও তাই প্রমাণ করে।
পুরনো কথায় ফিরে যাই। তখনকার দিনে সংবাদপত্রের অবয়ব আর আঙ্গিকগত দুর্বলতার কারণও দুর্বোধ্য কিছু না। প্রথমই আসে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা। যাতে করে ২০-২৪ পৃষ্ঠার কাগজ রাতারাতি ছেপে বের করে দেয়া ছিল অকল্পনীয়। যেনতেন প্রকারে হলেও। সামর্থ্যরে ব্যাপারটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি আজ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সংবাদপত্রের প্রধান উপজীব্য। খবরের মূল উৎস তাই রাজধানী নগরী, যা ছিল আমাদের অনেক দূরবর্তী। এই একটি কারণেই ঢাকার কাগজে তিন-চারজন প্রতিবেদক থাকলেই যথেষ্ট গণ্য করা হতো। এক বা দু’জন প্রতিবেদক নিয়েই কোনো কোনো কাগজ দিব্যি চলে যেত। ফলে সংবাদ সংস্থা আর জনাকয় অনুবাদপটু সহ-সম্পাদক থাকলেই হতো। আজকের ২০-২৪ পৃষ্ঠার কাগজ ছিল তাই কল্পনারও বাইরে।
গ্রাহক/ক্রেতার পয়সায় পত্রিকায় উৎপাদন খরচ উঠে আসে না। বিজ্ঞাপনের আয়ের ভর্তুকিতেই পত্রিকা চলে। ব্যবসা আর শিল্পে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে বিজ্ঞাপন আসবে কোথা থেকে? ছ-পৃষ্ঠার কাগজ খবর দিয়ে ভরাতেই সাংবাদিকদের তাই হিমশিম খেতে হতো। একটা মজার খবর এই ফাঁকে বলে রাখি। পাতা ভরানোর দ্রুত তাগিদে সহ-সম্পাদকের অনেক সময় কাচি চালাতে হতো।
ব্যাপারটা ছিল এরকম- ভেতরের পাতাগুলো সাধারণত সকালের পালাকে মফস্বলের খবর আর কম গুরুত্বপূর্ণ খবর দিয়ে ভরাতে হতো। ছাপাখানার চাহিদা লিখে মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালে আগের দিনের অন্য কাগজ ঘেঁটে বের করা হতো কোন কোন খবর এ কাগজে যায়নি। কাঁচি দিয়ে তাই কেটে নিয়ে শিরোনামটা দরকার মতো বদলে চালিয়ে দেয়াই ছিল তখন স্বীকৃত উপায়।
প্রযুক্তিগত উন্নতির কিছু ছোঁয়া আমাদের স্বাধীনতার আগেই লাগতে শুরু করেছিল। সিসের হরফের জায়গায় মনো টাইপ, লাইনো টাইপ কোথাও কোথাও চালু হলো। ফ্ল্যাটবেড মেশিনের জায়গায় রোটারি থেকে ওয়েব অফসেট চালু হতে শুরু করল। স্বাধীনতার পর পরিবর্তনের গতি হলো আরো ত্বরান্বিত।
প্রথমত, স্বাধীন দেশে পত্রিকার গুরুত্ব আর সুযোগ দুই-ই বাড়ল। শখ বা রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রকাশনা শিল্প হয়ে ওঠার পথে পা বাড়াল। সঙ্গতভাবেই সংবাদপত্রে মোটা পুঁজি আসার পথ তৈরি হলো। দ্বিতীয়ত, কম্পিউটারের ব্যবহার চালু হওয়ায় প্রযুক্তিগত উন্নতি শীর্ষে পৌঁছাল। সব মিলে সম্ভব হলো আজকের ঝকঝকে চেহারার বর্ধিত কলেবরের সংবাদপত্র। নেহাত খবর আর কিছু ব্যাখ্যা-ভাষ্যের অতিরিক্ত আজ সংবাদপত্রের উপজীব্যে যুক্ত হয়েছে। অবশ্যিই একে সমৃদ্ধি বলে গণ্য করতে হবে।
আমাদের সময়ের আর এখনকার সাংবাদিকদের দিকে চোখ ফেরানোও কিছু পার্থক্য বা পরিবর্তন চোখে পড়বে। সাংবাদিকতা একটা পেশা। আমাদের সময়ে এ নিয়ে যে কথাটি চালু ছিল তা হচ্ছে- পেশা হলেও তা একটু ভিন্ন চরিত্রের। এর সঙ্গে যুক্ত আছে কিছু ভিশন বা ব্রত। কল্যাণ-ব্রত। দেশ এবং জাতি তথা মানুষের কল্যাণ। আর এমন একটা ব্রত যুক্ত থাকার ফলেই আড়াইশ’ তিনশ’ টাকার বেতন ভেঙে ভেঙে নিয়েও একজন সাংবাদিক পেশায় অটল থাকতে পারতেন। নিজেই তো প্রথম আড়াইশ’ টাকা বেতনে সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছিলাম। যদিও তার আগেই প্রথম বেতন বোর্ড চালু হয়ে গিয়েছিল। এটুকু বেতনও মাস শেষে একসঙ্গে পাওয়া যেত না। ভেঙে ভেঙে নিতে হতো। মাস কয়েকের বেতন পড়ে থাকত বকেয়া!
এদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকেই সংবাদপত্রের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। স্বভাবতই সাংবাদিকদের একটা বড় অংশই আসত রাজনীতি থেকে। ওরা বেতনের চেয়ে কাজটাকেই বড় করে দেখত। আয়ের সীমাবদ্ধতা তরুণদের এ পেশায় তেমন আকর্ষণ করত না। যারা আসতেন তাদের অনেকেই আসতেন সাময়িকভাবে পা রাখার একটা অবলম্বন খুঁজে। এদের কেউ কেউ ক্রমে এ পেশার মায়ায় আবদ্ধ হয়ে এখানেই থেকে গেছেন এবং ভালোই করেছেন। অন্য এক দল ছিলেন যারা ছাপাখানা কিংবা সংশোধনী বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এতে যোগ দিতেন। এর ভালো মন্দ দুটি দিকই ছিল। তবে ব্রতের ব্যাপারটা অটুট থাকত সন্দেহ নেই। অর্থাৎ সাংবাদিকতায় নৈতিক দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন বড় একটা ঘটত না।
এ যুগে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। নতুন প্রজন্মে সাংবাদিকরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। তাদের একটা বড় অংশ পেশাগত শিক্ষা আর প্রশিক্ষণেরও অধিকারী। কিন্তু প্রকরণগত ছাড়া সাংবাদিকতার মান কি খুব একটা বৃদ্ধি পেয়েছে? এ প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা- জানি, দূরের বাদ্য মধুর শোনায়। অতীতের স্মৃতি হলে মধুরতর। বুড়োদের বিরুদ্ধে তাই অভিযোগ আছে- তারা অতীতটাই বড় বা সুন্দর বলে ভাবে এবং দেখাতে চায়। নিজের বয়সটা তো ভুলতে পারি না। তাই অস্বীকার করতে পারি না, এমন একটা অভিযোগের মুখে পড়ার আশঙ্কা। তবে হ্যাঁ, সত্যের খাতিরে স্বীকার করতেই হবে, নৈতিকতার বাঁধনটা ইদানীং অনেকটাই শিথিল হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্তিত্বহীন বলেও প্রতীয়মান হয়। চাকচিক্য আর মোটা প্রাপ্তির প্রলোভন সংবাদগোষ্ঠীকে অনেকটাই শব্দকর-এ পরিণত করতে বসেছে। অন্যের হয়ে ঢোলসহরত করাই যেন সাংবাদিকের কাজ। এমন একটা পরিবর্তন প্রশংসনীয় হতে তো পারেই না, কাম্যও হতে পারে না। সাংবাদিকদেরই এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
ভিন্নতর প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার একটা অতি তুচ্ছ উদাহরণ দিয়ে এ প্রসঙ্গের ইতি টানি। পরিবর্তনটা দেখা দিতে শুরু করেছে বেশ আগ থেকেই। তাই উদাহরণটাও দিচ্ছি একটু পুরনো।
আমার সাংবাদিকতার শেষদিকে (১৯৯৭) আমি ঢাকা ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এক সন্ধ্যায় ফেডারেশন অফিসে গিয়ে দেখি দুই তরুণ সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে তীব্র বিতণ্ডায় লিপ্ত। ব্যাপারটা কি জানতে চাইতেই সাধারণ সম্পাদক বলে উঠলেন- আপনি এদের সামলান।
কথা বলে বুঝলাম ওরা এসেছেন ফেডারেশন থেকে জার্মানি ভিসার জন্য অনুরোধ বা অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করতে। একজন কিশোর জার্মানিতে খেলতে যাচ্ছে। ওরা যে খেলার খবর সংগ্রহের জন্য জার্মানি যাবেন তাদের পত্রিকার পক্ষ থেকে। ওদের দাবি তাদের পত্রিকাই তাদের পাঠাবে।
অনেকভাবে চেষ্টা করেও বোঝাতে পারছিলাম না, দাবার খবরের জন্য বিদেশে প্রতিবেদক পাঠানোর পরিবেশ এদেশে তৈরি হয়নি। আর ফেডারেশন এ জাতীয় চিঠি কখনো দেয় না। ওদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তাদের দাবি ওদের পত্রিকা যদি পাঠায় আমাদের তাতে বলার কি আছে। শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলাম- আমি নিজেও একজন সাংবাদিক। সংবাদপত্রের অবস্থা জানি। আমাদের পক্ষে এ ধরনের চিঠি দেয়া সম্ভব নয়।
এ পর্যায়ে কে একজন পাশ থেকে আমার পরিচয়টাও বলে দিল। তখন সাংবাদিক মহলে অন্তত আমার কিছু পরিচিতি ছিল। ওরা কিন্তু আমাকে চিনতে পারেনি। তাই পরিচয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল। তবে চলে যেতে যেতে কটুবাক্যের সঙ্গে দেখে নেয়ার হুমকি ছড়ানো বাদ দিল না। বুঝলাম, বিদেশে সহজে পাড়ি জমানোর ফাঁক খুঁজতে ওদের সাংবাদিকতায় আসা। অতি সামান্য ব্যাপার। তবু এটাই বললাম যে, বুদ্ধিমানের জন্য সামান্য ইশারাই যথেষ্ট। আমি পাঠকদের বুদ্ধির ওপর আস্থাশীল। আমরা ক্রমে কোন দিকে চলেছি- তার আভাস দিতেই এ ঘটনার উল্লেখ।
শেষ করার আগে যে কথাটি বলা জরুরি মনে করি তা হচ্ছে এই- আমি কিন্তু আমাদের সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ সাংবাদিকদের অনেকের কাজই আমাকে উৎসাহিত করে। প্রয়োজন কেবল পেশাগত নৈতিকতা আর দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আরেকটু সচেতনতা।