সরগরম হয়ে উঠেছে ছাপাখানাগুলো

সরগরম হয়ে উঠেছে ছাপাখানাগুলো

নির্বাচনের তারিখ যতই এগিয়ে আসছে, প্রার্থীদের পোস্টার ছাপাতে সরগরম হয়ে উঠছে ছাপাখানাগুলো। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ হবে ১০ ডিসেম্বর। এর পর থেকেই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরু হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ‘শুভেচ্ছা’, ‘আশীর্বাদ’ সংবলিত পোস্টার ছাপানোর কাজে এতদিন ব্যস্ত ছিল ছাপাখানা। এখন শুরু হচ্ছে মূল কাজ। ভোটযুদ্ধে নামা চূড়ান্ত প্রার্থীরা পোস্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেট, স্টিকার ছাপাতে ভিড় করছেন ছাপাখানাগুলোতে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অনেক আসনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়েও ছিটকে পড়েছেন অনেক প্রার্থী। তারা তাদের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার জন্য আপিল করেছেন ইসিতে। সব আসনে সবদলের প্রার্থী চূড়ান্ত হলেই ছাপাখানাগুলোর ব্যস্ততা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা। এ ছাড়া মিছিল, সভা থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক সরবরাহ করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি মেরামত করে নিচ্ছেন মাইক ব্যবসায়ীরা।

নতুন বছরের ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, পাঠ্যপুস্তক, একুশের বইমেলা উপলক্ষে সৃজনশীল বই ছাপানোর কাজে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ব্যস্ত থাকে ছাপাখানাগুলো। তার ওপর এসে গেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের পোস্টার ছাপার চাপও পড়েছে প্রেসগুলোর ওপর। সব মিলিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে ছাপাখানাগুলো। ছাপাখানা ছাড়াও ডিজিটাল ব্যানার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সাইন মিডিয়াগুলোতেও একই চিত্র। তারাও প্রার্থীদের সঙ্গে তদবির করে ডিজিটাল ব্যানারের অর্ডার নেয়ার চেষ্টায় রয়েছেন।

রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বেশি ছাপাখানা রয়েছে ফকিরাপুল, মতিঝিল, আরামবাগ এলাকায়। ছাপাখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে তারা কাগজ, কালিসহ বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করে রেখেছেন। এ সুযোগে বাজারে এসব উপকরণের দামও বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে ভোটযুদ্ধে নামা চূড়ান্ত প্রার্থীরা তাদের পোস্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেট, স্টিকার ছাপানো শুরু করেছেন। অনেক রাজনৈতিক দল এখনো জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। আবার অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় ছিটকে পড়েছেন। ছিটকে পড়া প্রার্থীরা প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার জন্য আপিল করেছেন ইসিতে। সব আসনে সব দলের প্রার্থী চূড়ান্ত হলেই ছাপাখানাগুলোর ব্যবস্থা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা।

শুধু রাজধানী নয় দেশের প্রতিটি এলাকার ছাপাখানায় একই চিত্র। সবাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পোস্টারের অর্ডার নেয়া শুরু করেছেন। অনেকে পোস্টারের অর্ডার নেয়ার চেষ্টা করছেন।

ছাপাখানার মালিকরা জানান, মনোনয়নের দৌড়ে টিকতে নেতাকর্মীরা আগে থেকেই নিজেদের প্রচারের জন্য এক দফা পোস্টার তৈরি করে প্রচার কার্যক্রম চালিয়েছেন। জনসাধারণের কাছে নিজেকে বা নিজের প্রার্থীকে পরিচিত করে তুলতে দুই থেকে তিন মাস আগ থেকেই গ্রাম ও শহরের নেতারা নিজেদের নাম ও ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টাঙিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে লাগিয়েছেন ছবি সংবলিত স্টিকার। এ ছাড়া শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করে সেগুলো দিয়েও চলছে প্রচার। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সেসব পোস্টারগুলো অপসারণ করা হয়েছে। এখন বড় রাজনৈতিক দলসহ ছোট দলগুলোর নিশ্চিত প্রার্থীদের মধ্যে কারো কারো পোস্টার ছাপানোর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও অর্ডার দিয়েছেন। তাদের অনেকের পোস্টারের ডিজাইন ও প্লেট তৈরি করা হয়ে গেছে। আসন ভাগাভাগি আর আপিলের ফলাফলের পর তাদের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে তাদের পোস্টার ছাপানোর কাজ শুরু করা হবে।

ছাপাখানার কর্মীরা বলছেন, নতুন বছরের ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, পাঠ্যপুস্তক, একুশের বইমেলা উপলক্ষে সৃজনশীল বই ছাপানো উপলক্ষে এক মাস ধরে কাজের চাপ বেড়েছে। এখন আবার নতুন করে পোস্টার ছাপানোর কাজ। আমাদের কষ্ট হলেও বাড়তি কিছু টাকা আয় করতে পারব। তারা জানান, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে কাজ আরো বাড়বে। আরামবাগের সিকদার ট্রেডার্সের মালিক ছগির সিকদার বলেন, নিশ্চিত ভোটযুদ্ধে লড়বেন এমন প্রার্থীদের পোস্টার ছাপার কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আর যাদের প্রার্থিতা নিয়ে ঝামেলা আছে তাদের অর্ডার নিয়েছি। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে ছাপার কাজ শুরু করব।

তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে এক প্রকার রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। অস্থির রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রিন্টিং ব্যবসায়। এরপর রাজনৈতিক সংকট কাটলেও রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই থমকে দাঁড়ায়। ফলে রাজনীতিকেন্দ্রিক পোস্টারের ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। তিনি মনে করেন, এ বছর জাতীয় নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করায় মনে হচ্ছে ছাপাখানা আবার সচল হবে।

আরেক প্রেস মালিক সুজন মিয়া বলেন, আমরা ইতিমধ্যে নির্বাচন উপলক্ষে পোস্টার ছাপানোর বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থীদের পোস্টার ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। পোস্টার তৈরির জন্য পর্যাপ্ত কাগজ, বিভিন্ন ধরনের রঙ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে রেখেছি। আসন ভাগাভাগি শেষ হলেই পুরোদমে পোস্টার ছাপানোর অর্ডার আসতে শুরু করবে।

আরামবাগ এলাকার সোনালী প্রেসের ব্যবস্থাপক তোফায়েল ইসলাম বলেন, ফকিরাপুল ও আরামবাগ এলাকার ছাপাখানা ব্যবসায় কয়েক বছর ধরেই মন্দা যাচ্ছে। গত বছর ঈদ ও বৈশাখ ঘিরে কোনো কাজের অর্ডার আসেনি। তবে এবার জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আমরা আশাবাদী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মনে হচ্ছে এতদিন পর ছাপাখানাগুলোতে কাজের ধুম লেগেছে। সব মিলে এখন বেশ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.