সম্পর্কের নতুন দিগন্তে ঢাকা-দুবাই

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধটা বাধে ২০১৩ সালে। যখন ওয়ার্ল্ড এক্সপো-২০২০ নির্বাচনের সময় দুবাইকে প্রথম দফায় ভোট না দিয়ে রাশিয়াকে ভোট দেয় বাংলাদেশ। প্যারিসে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনটি তিন দফা চলে এবং আমিরাত রাশিয়াকে পরাজিত করে ওয়ার্ল্ড এক্সপোর ভেন্যু হিসেবে নির্বাচিত হয়। কিন্তু ভোট না দেয়ায় এটিকে সহজভাবে নেয়নি আরব আমিরাত সরকার। এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ব্যাপক জটিলতা তৈরি হয়। এরপর ৬ বছরে বন্ধ থাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম এই শ্রমবাজারটি আর খোলেনি। এমনকি সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের কোনো উদ্যোগকেই আর পাত্তা দেইনি দেশটি। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবাই সফরের সময়ও জটিলতার অবসান সম্ভব হয়নি। তবে শেখ হাসিনার এবারের সফরের মাধ্যমে আরব আমিরাত তার সেই অবস্থান থেকে সরে এল, যা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত শুরু হলো বলা যেতে পারে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড এক্সপো নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ দুবাইকে সমর্থন দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি আরো সহজ হতো। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ রাশিয়াকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সিদ্ধান্ত হয় প্রথম দফায় রাশিয়াকে ভোট দেয়া হবে এবং পরবর্তী সময়ে আমিরাতকে সমর্থন দেয়া হবে। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের ফেরত নেয়ার বিষয়টিতেও চাপ দেয় আমিরাত। পরে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর দুবাই সফরের সময় নিরাপত্তা ও বন্দিবিনিময় সংক্রান্ত বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের কারণে বাংলাদেশের ওপর আমিরাত সরকারের কিছুটা ভরসা বাড়লেও শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে রাজি হয়নি তারা। সম্পর্ক উন্নয়নের বাংলাদেশের কূটনীতিকদের গুরুত্ব দেয়াও কমিয়ে দেয় তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রায় প্রতিদিনই আমিরাতের সংবাদপত্র বাংলাদেশিদের অপরাধসংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করছে। আমিরাতের জেলখানায় বাংলাদেশি কয়েদির সংখ্যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। আমিরাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির তীব্র সংকট রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে দেশটিতে অভিযুক্ত আসামি। এর মধ্যে ১৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং ১০৪ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তারা খুন, ডাকাতি, চোরাকারবারি, জুয়ার আসর বসানো থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা এখন প্রায় এক কোটি। এর মধ্যে স্থানীয় আরব আছে ৯ লাখ। বাকিরা বিভিন্ন দেশের অভিবাসী। বাংলাদেশি আছে ১০ লাখের মতো। স্থানীয়রা সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে নিরাপত্তাজনিত বিষয় ও বেআইনি কার্যকলাপে আমিরাতের স্থানীয়রা বেশ স্পর্শকাতর। তবে নিরাপত্তা ও বন্দিবিনিময় সংক্রান্ত বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর এবং প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মাধ্যমে আমিরাতের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেয়া বন্ধ করার পর ২০১৬ সালে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী সব অন-এ্যারাইভেল ভিসা দেয়া করে দেশটি। জানা যায়, শুধু বাংলাদেশিদের অন-এ্যারাইভেল ভিসার ক্ষেত্রেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটি। এ ছাড়া বাংলাদেশি কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও নানাভাবে হয়রানি করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সিআইপি কার্ডধারী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন-এ্যারাইভেল ভিসা পেতেন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেসব বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং সেসব দেশকে তারা নিয়মিত ট্যাক্স দেন তাদের অন-এ্যারাইভেল ভিসা দিত দেশটি। হঠাৎ তাদের অন-এ্যারাইভেল ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। এ ব্যাপারে কোনো কারণও উল্লেখ করা হয়নি। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকেও জানানো হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরে দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় সম্পর্কের সেই জটিলতার অবসান হলো। এখন বাংলাদেশকে বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পাশাপাশি শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহকেও ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে দেশটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবাই সফরে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনায় এ বিষয়ে আশ্বাস মিলেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির লুলু গ্রুপ ও এনএমসি গ্রুপ। সোমবার আরব আমিরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের বৈঠকের পর এমন খবর দেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।

আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে বৈঠকের আগে সোমবার সকালে আবুধাবি এক্সিজিবশন সেন্টারে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক হয় আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মাদ বিন রশিদ আল মাকতুমের। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও প্রেস সচিব ইহসানুল করিম একসঙ্গে এসে আলোচনার বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশকে ইউএই বিনিয়োগের একটা বড় নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে- এ কথা দুবাইর শাসক বারবার বলেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, জনশক্তির বিষয়টি ওনারা ওপনেলি কনসিডার করবেন। এ ছাড়া রাজকীয় প্রাসাদে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। এ সময় ক্রাউন প্রিন্স জানান, শ্রমবাজারের বিষয়টি উনি দেখবেন, বিনিয়োগের বিষয়টিও উনি দেখবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সব বিষয়েই যে একটা গুরুত্ব পাবেন, সেটা উনি বলেছেন। ক্রাউন প্রিন্স বাংলাদেশ সফরেও আসবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুবাইর শাসক এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শ্রমবাজার নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালেই দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা হয়। এটাও খুব আনইউজুয়াল। সচরাচর প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় ফরেন অফিস কনসালটেশন হয় না। আমিরাতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তার লেখা ‘মাই ড্রিম’ বইয়ের বাংলা অনুবাদ ‘আমার স্বপ্ন’ রশিদ আল মাকতুমের হাতে তুলে দেন শেখ হাসিনা। দুবাইয়ের শাসকের সঙ্গে বৈঠকের পর আবুধাবির বাহার প্যালেসে ইউএইর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং আবুধাবির শাসক প্রয়াত শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের স্ত্রী শেখা ফাতিমা বিনতে মুবারক আল কেতবির সঙ্গে দেখা করেন শেখ হাসিনা।

ওদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, পর্যটন, রিটেলই চেইন শপসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে আবুধাবিভিত্তিক লুলু গ্রুপ ও এনএমসি গ্রুপ। আবুধাবি সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মঙ্গলবার সকালে তার আবাসস্থল হোটেল সেন্ট রেগিজে দেখা করেন লুলু গ্রুপের চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী এবং এসএমসি গ্রুপের চেয়ারম্যান বি আর শেঠী।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, লুলু গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেছেন, অনেক এরিয়া রয়েছে যেসব খাতে উদ্ভাবন করা যায়। উনি ঢাকার কাছে এবং বাইরে জমি চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, দেয়া হবে। লুলু গ্রুপের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় হাইপার মার্কেট রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এআর