সমৃদ্ধ পৃথিবীর জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় অবিভক্ত ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৩ কোটি। বর্তমানে অর্থাৎ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর সাবেক ভারত ত্রিখণ্ডিত। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে তিনটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র। ২০১১-র জনগণনা অনুসারে কেবলমাত্র ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১২১ কোটি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি আর পাকিস্তানে ১৯ কোটি। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অনুন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

এশিয়ার চীন ও ভারতের জনসংখ্যা বিশ্বের মধ্যে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ভারত চিনকে ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, বর্তমানে চিনের চেয়ে ভারতে জন্মের হার বেশি ও অনিয়ন্ত্রিত। লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদরা খুবই চিন্তিত।

আজ থেকে ৪৭ বছর আগে বাংলাদেশে স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্মলগ্নে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে এক বড় রকমের সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হতো না যদিও পাশ্চাত্যের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস জনসংখ্যার হার নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন কিন্তু এসবকে চিন্তাবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীরা খুব একটা গুরুত্ব দেননি। সরকারি তরফেও তা বস্তুত গুরুত্বহীন ছিল। ৪৭ বছর আগে দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রতি পরিবারের ১ বিঘা থেকে ৫ বিঘার মধ্যে বসতবাড়ি ছিল, সঙ্গে পুকুর ও সবজি ক্ষেতের জায়গা। কৃষিযোগ্য ভূমিও প্রতি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ছিল। মাঠে গরু-মহিষ ইত্যাদি গৃহপালিত পশুর জন্য গোচারণভূমি ছিল।

এছাড়া খাসজমিতে জলাভূমি, ছোট ছোট বিল, নালা ছিল। এতে প্রচুর মাছ হেমন্তেও পাওয়া যেত। কৃষিজমিতে যে ফসল উৎপাদন হতো এতে সারা বছরের খাদ্যশস্য ঘরে মজুত থাকত। বাড়তি ধান বা অন্য খাদ্যশস্য বাজারে বিক্রি করা হতো। এমনকি গরিব চাষিদেরও বাজার থেকে ধান-চাল কেনার প্রয়োজন হতো না। বেশিরভাগ পরিবার শাকসবজি ক্রয় করতে হাটে যেত না। হাট থেকে শুধু ভোজ্যতেল, কেরোসিন, চিনি, চা, লবণ ইত্যাদি ক্রয় করলেই হতো। বস্ত্র, অলঙ্কার, প্রসাধন সামগ্রীর চাহিদাও সীমিত ছিল। ফলে আর্থিক লেনদেন অত্যন্ত সীমিত ছিল। দূরবর্তী স্থানে যাতায়াতের জন্য রেলগাড়িতে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ প্রয়োজনে যাতায়াত করতেন। ৪-৫ মাইল দূরত্বে যেতে হলে হেঁটেই যাতায়াত করা স্বাভাবিক ছিল। এমনকি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীও অনায়াসে রোজ ৪-৫ মাইল হেঁটে পড়াশোনা করতে শঙ্কাবোধ করত না। আমরাও করিনি।

বর্তমানে আমরা কী দেখতে পাই। প্রথমেই গ্রামাঞ্চলের কথায় আসি। চার দশক আগে যে পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছিল ৫ থেকে ১০ জন সেই পরিবার ভেঙে এখন ন্যূনতম ১০ পরিবার হয়েছে এবং সব পরিবার মিলে জনসংখ্যা ৫০-এর অধিক। বাধ্য হয়ে ১০ পরিবারের আবাসগৃহের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে কৃষি জমি ভরাট করে বাসস্থান তৈরির প্রয়োজন হয়েছে। এতে কৃষিভূমি সংকুচিত হচ্ছে অথচ খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। যে-সব খাসভূমি গোচারণের জন্য ছিল, তাও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সময় অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত মালিকানায় পাট্টা দেয়া হয়েছে। ফলে অনেক কৃষিজীবী মানুষ গো ও মহিষ পালন বাদ দিয়েছেন। তাই দুধের ঘাটতি ঘটে। আবার অনেক কৃষিভূমি ও অনুর্বর জমিতে নতুন নতুন ইটভাটা, ছোট ও মাঝারি ফ্যাক্টরি, কারখানা গড়ে উঠেছে এবং আরো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কাজ চলছে।

প্রতিটি একান্নবর্তী পরিবার জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। কৃষিভূমিতে বাসস্থান ও কলকারখানা নির্মাণে খাদ্যশস্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার পিতৃপুরুষের ভূমিতে বাসস্থানের অভাব ও কৃষিভূমি সংকুচিত হওয়ার ফলে নতুন ঠাঁইর সন্ধানে সরকারি খাসভূমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন কেটে বসত করতে শুরু করেছে। অতীতের অনেক সচ্ছল কৃষক পরিবারের উত্তরসূরিরা এখন ভূমিহীন, কর্মহীন হয়ে দিনমজুরি, রিকশা বা ঠেলা চালিয়ে বাঁচার সংগ্রামে অবতীর্ণ।

সে-সব বেকার যুবক কোনোভাবেই কাজের সুযোগ পাচ্ছে না, তারা হতাশাগ্রস্ত এবং অনেকে অপরাধ জগতে প্রবেশ করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। যুব প্রজন্মের অনেকে আবার নেশাসক্ত হয়েছে। ফলে সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এদিকে, গ্রামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরেও জনসংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কেবলমাত্র জন্মবৃদ্ধিই একমাত্র কারণ নয়। গ্রাম থেকে অনেক সচ্ছল পরিবার গ্রামের ভিটেমাটি বিক্রি করে বসবাসের জন্য শহরে চলে আসছে।

যেহেতু, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত নয়, তাই শহরে আসার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে আমাদের শহরগুলোয় শ্বাস ফেলার মতো ফাঁকা জায়গা প্রায় নেইই। পুকুর ভরাট করে দালানবাড়ি তৈরি হচ্ছে। আশপাশের গ্রামকেও শহরের আওতায় আনা হচ্ছে, তবু স্থান সংকুলান হচ্ছে না। তাই ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যানবাহন যত বাড়ছে তার জন্য শহরে পার্কিংয়ের জায়গারও অভাব দেখা দিয়েছে। অসংখ্য যানবাহন থেকে নির্গত গ্যাসে বায়ুদূষণ ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, রোগ ব্যাধিও বাড়ছে। সবকিছুর জন্য দায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি।

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো- সে সব রকমের ভোগ্যবস্তু পেতে চায়। আর তা পেতে দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচার, পাপ পথে অর্থোপার্জনের দিকেও ধাবিত হয়। বড় বড় শহরে বাড়ি, গাড়ি ও সম্পদ আহরণে এক মরিয়া প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাণিজ্যের কথায় যদি আসি, তাহলে আমরা ভালোভাবে জানি, বাংলাদেশ গ্যাট চুক্তি ও ডব্লিউটিও-তে স্বাক্ষরকারী দেশ। তাই বিদেশের ভোগ্যপণ্য এ দেশের বাজারে আমদানিতে সরকার খুব বাগড়া দিতে পারবে না। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে কড়া পদক্ষেপ বা কড়া আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে অধিক জনসংখ্যাবহুল দেশ চীন যেভাবে কড়া হাতে জন্ম নিয়ন্ত্রণে নীতি-নির্দেশিকা বলবৎ করেছে, তাতে কোনো দম্পতি এক সন্তানের অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না।

এই কঠোর নীতি চালু করায় চীনের জনসংখ্যা বর্তমানে স্থিতাবস্থায় রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে তাদের বর্তমান জনসংখ্যাও হ্রাস পাবে। বিপরীতে, বাংলাদেশে অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা আগেই উল্লেখ করেছি। চীনে যেভাবে জনসংখ্যা হ্রাসে কড়া দাওয়াই প্রয়োগ করা হয়েছে, আমাদের মতো গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এ দেশের সরকারের পক্ষে যা সম্ভব তা হলো, দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ানোয় সচেষ্ট হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যাবলি সুন্দরভাবে মোকাবিলা করা। এ বিষয়ে সমাজসচেতন নাগরিক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও বোদ্ধাদের সদর্থক ভূমিকাও থাকতে হবে। দেশে শিক্ষিতের হার যত বাড়বে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তত হ্রাস পাবে।

যে কোনোভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে স্থিতাবস্থায় আনতে হবে তারপর হ্রাস করার লক্ষ্যে সদর্থক পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সমাজে ভ্রষ্টাচার, দুর্নীতি, অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা আরো প্রকট হবে যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। যার আভাস আমরা এখনই টের পাচ্ছি। ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক ভারসাম্য আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। সুতরাং এ বিষয়ে সব নাগরিককে সচেতন হয়ে নবপ্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের সবারই। – লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এএএম