সমীকরণ জটে রাজনীতির মাঠ

রনি রেজা :
বিএনপি নির্বাচনে না গেলে তারাই বা কী করবেন সে সিদ্ধান্তও এখনো স্পষ্ট নয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মধ্যেও রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। এরশাদের জাতীয় পার্টি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কী করবে? এবারো বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচন করবেন নাকি জোটগত নির্বাচনে যাবেন সেটা নির্ভর করছে ওই বিএনপির ওপরই। সম্প্রতি এরশাদ বলেছেনও, বিএনপি নির্বাচনে গেলে জোটবদ্ধ থাকবেন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে করে এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। কিন্তু এখনো রয়েছে সমীকরণ জট। হিসেব মিলছে না সহজেই। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রাম-বাংলার হাট-মাঠ-ঘাট হয়ে চায়ের দোকান পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতির আলোচনা। রঙিন ফেস্টুন-ব্যানার-বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে পাড়া-মহল্লা। মাঠপর্যায়ের নেতারা যোগাযোগ শুরু করেছেন কেন্দ্রে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের গাড়ি, সমর্থকদের মোটরসাইকেল ও ছোট ছোট জনসভা দখল করে রেখেছে গ্রামবাংলা। চলছে জনসংযোগ, কুশল বিনিময়। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। ৩১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ক্ষণ-গণনা শুরু হবে। সে সময়কে বিবেচনায় রেখে সেপ্টেম্বর খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাস হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। যদিও অক্টোবরেই সব কিছুর চূড়ান্ত হবে; কিন্তু সেপ্টেম্বরেই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন-সংক্রান্ত অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর এ নিয়েই এত তোড়জোড়।
আমাদের দেশে রাজনীতির অপর নাম দেয়া যেতে পারে নির্বাচন। নির্বাচন এলেই শুরু হয় সমস্ত হিসাব-নিকাশ। প্রার্থীর ব্যক্তিকর্ম থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম, ভুল-ত্রুটি, অর্জন-বর্জন; সবই স্থান পায় নির্বাচনী আলোচনায়। সমস্ত চাপা কথা, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব প্রকাশ পায় নির্বাচনের মাঠে। সরগরম থাকে রাজনীতির মাঠ। বলা যায়, উৎসবে পরিণত হয় এটি। আমাদের দেশে নির্বাচন শুধু রাজনীতিবিদ, তাদের সমর্থক এবং নীরবে-নির্বিঘেœ শুধু ভোট দেয়ার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিশু-কিশোর, যুবা, বৃদ্ধ জড়িয়ে পড়ে অনায়াসেই। তাতে জনজীবন রাজনীতির মধ্যে হারিয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় নির্বাচন কেন্দ্র করে যে অফিসগুলো হয়, সেগুলো একেকটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়। হৈ-হুল্লোড়, মিছিল-মিটিং, বিনামূল্যে চা-সিগারেট-পান এবং নাশতার আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এ আমেজ। যদিও অংশগ্রহণ হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতে। তাই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনও পরিলক্ষিত হয়। নানা গুঞ্জন শুরু হয় রাজনীতির মাঠে। এবারো শুরু হয়েছে। এদিক থেকে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট হলেও অন্যান্য দলের অবস্থান খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। বিএনপির সামনে রয়েছে কঠিন সমীকরণ। খালেদার কারামুক্তি, তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে রায় কী হয়, পুরনো দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসবে কিনা এবং নতুন ইস্যু ইভিএম সম্পর্কে সরকারের অবস্থান; সব হিসাব মিলিয়ে নির্বাচনে যাওয়া- না যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধন্ত নেবে দলটি। দেশের অন্যতম বৃহৎ দল হওয়ায় বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটা নির্ভর করতে হচ্ছে অন্য দলগুলোকে। এতদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও দলের বাইরে নতুন করে জোট গঠনের আলোচনা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ছোট ছোট দল যুক্ত হচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে। পুরনো জোটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতৃত্বাধীন যথাক্রমে ১৪ দল ও ২০ দলীয় জোট সম্প্রসারণের কথাও শোনা যাচ্ছে। এমনকি এই দুই দলের বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের আলোচনাও চলছে জোরেশোরে। বিএনপির সঙ্গে আরো ১৯টি দলের জোট রয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে না গেলে তারাই বা কী করবেন সে সিদ্ধান্তও এখনো স্পষ্ট নয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মধ্যেও রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। এরশাদের জাতীয় পার্টি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কী করবে? এবারো বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচন করবেন নাকি জোটগত নির্বাচনে যাবেন সেটা নির্ভর করছে ওই বিএনপির ওপরই। সম্প্রতি এরশাদ বলেছেনও, ‘বিএনপি নির্বাচনে গেলে জোটবদ্ধ থাকবেন। আর বিএনপি না গেলে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবেন।’ অর্থাৎ ছক কষলেও এখনো নির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি আবার সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে যুক্তফ্রন্ট নামে নতুন জোট। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত হয়েছিল নির্বাচনী জোট যুক্তফ্রন্ট। সেই জোটে ছিল আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি আর গণতন্ত্রী দল। নেতৃত্বে শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সেই জোটের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল মুসলিম লীগ। ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে তেমন একটি জোট গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার অংশ হিসেবে বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন তিনদলীয় জোট যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের নেতৃবৃন্দ। তাদের এ বৈঠকের মাধ্যমেই চূড়ান্ত করা হবে জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা। এই রূপরেখায় নিরপেক্ষ নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে পরবর্তী সরকারের দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে ড. কামাল হোসেনের ‘গণফোরাম’ আর ডা. বি চৌধুরীর ‘বিকল্পধারা’। এই মিলনকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে। কারণ এই জোট আর তাদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। যারা এই জোটে আছেন তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সবারই গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক অতীত আছে এবং অবশ্যই তা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে। ড. কামাল হোসেন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য। একজন আইনজীবী হিসেবে তার খ্যাতি অসামান্য। সংবিধানের প্রণেতাও তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি অভিযুক্তদের পক্ষে একজন জুনিয়র আইনজীবী ছিলেন। তখন থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর নজরে আসেন। সম্পৃক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু তাকে পররাষ্ট্র ও আইনসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। তার বড় কীর্তি তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনা টিমের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৮১ সালে তিনি বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে হেরে যান। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’-এর জন্য গঠন করেছিলেন ‘গণফোরাম’। সেদিক থেকে এ জোটটিকেও গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এছাড়া ছোট ছোট দল যুক্ত হচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে। সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও সমীকরণ অনেকটা অস্পষ্টই রয়ে গেছে রাজনীতির মাঠে।